বিশ্বসেরা ফ্যাশন হাউজ: হার্মেস (Hermès)

“ফ্রান্স” পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। দেশটির নামের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, স্থাপত্যশৈলী ও ফ্যাশন। ফরাসি সংস্কৃতি জগদ্বিখ্যাত; শিল্পকলা, সাহিত্য, গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, নৃবিজ্ঞান, দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের উন্নয়নে ও প্রসারে ফ্রান্সের সংস্কৃতি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। মধ্যযুগ থেকেই প্যারিস পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ফরাসি রন্ধনশৈলী ও পোষাকশৈলী বিশ্বের সর্বত্র অনুসৃত হয়। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর অভিযাতদের আবাস্থল ফ্রান্স। তেমনি ফরাসি এক অভিযাত ফ্যাশন ব্র‍্যান্ড হচ্ছে “হার্মেস (Hermès)”। যে ফ্যাশন ব্র‍্যান্ড তৈরিই করা হয়েছিল সমাজের উচুঁ শ্রেণীর মানুষদের চাহিদা মেটানোর জন্য এবং এখন পর্যন্ত টিকে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন ফ্যাশন ব্র‍্যান্ড।

১৮৩৭ সালে টিয়্যারি হার্মেস প্রতিষ্ঠা করেন “হার্মেস (Hermès)” ফ্যাশন ব্র‍্যান্ডটি যা প্রথমত প্রতিষ্ঠা করা হয় সমাজের অভিযাতদের ঘোড়ার লাগাম তৈরি করার জন্য। পরবর্তীতে ১৯২০ সালের দিকে তারাই প্রথম আসল চামড়ার তৈরি ব্যাগ বাজারে আনে এবং তৈরি করে ফ্যাশন জগতের এক নতুন দিগন্ত। তাদের প্রথম চামড়ার তৈরি ব্যাগ বাজারজাত করা হয় ঘোড়ার জিন (saddle) বহন করার জন্য। কাজেই “হার্মেস (Hermès)” ব্র‍্যান্ডটির মূল মনোযোগ ছিলো ঘোড়া চড়ার বিভিন্ন ধরণের উপকরণের প্রতি। যা কিনা তারা আজো তৈরি করে আসছে। প্রথমত “হার্মেস” ব্র‍্যান্ডটি ছিলো পারিবারিক ব্যবসা যা শুধুমাত্র পরিবারের সদস্যদের দ্বারাই পরিচালিত হতো। হার্মেস এর প্রথম হ্যান্ডব্যাগটি তৈরি করা হয় তৎকালীন সময়ের ব্র‍্যান্ডটির পরিচালক “এমিল মরিস”- এর স্ত্রীর জন্য যে কিনা পুরো প্যারিসে তার মনমতো ব্যাগ খুজে পায়নি।

“হার্মেস (Hermès)” ব্র‍্যান্ডটি প্রথম সবার নজর কারে ১৯৫৬ সালে যখন গ্রেস কেলী (Princess of Monaco) তাঁরঅন্তসত্ত্বা হবার ব্যাপারটি লুকানোর জন্য হার্মেসের তৈরি একটি চামড়ার ব্যাগ ব্যবহার করেন। এই ব্যাগটি যেমন তুমুল জনপ্রিয়তা পায় তেমনিভাবে বিশ্ব দরবারে বেড়ে যায় “হার্মেস (Hermès)”-এর কদর। পরবর্তীতে তারা বাজারে প্রচলন করে “কেলী ব্যাগ”- এর এবং এর নামকরণ করা হয় “গ্রেস কেলী” র সম্মার্নাথে। হার্মেস ১৯১৪ সালে সর্বপ্রথম ফ্রান্সের বাজারে ছেলেদের পোশাকে জিপার (zipper) এর প্রচলন করে। হার্মেস প্রিন্স অফ ওয়েলস- “এডওয়ার্ড” এর জন্য সর্বপ্রথম জিপার দিয়ে একটি চামড়ার গলফ জ্যাকেট তৈরি করে যা কিনা তৎকালীন সময়ে ফ্যাশন দুনিয়ায় বিশাল এক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

“হার্মেস (Hermès)”-এর বেষ্টসেলার আরেকটি পণ্য হচ্ছে “বার্কিন (Birkin) ব্যাগ”। এটি ১৯৭০ দশকের জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী “জেন বার্কিন”- এর নামানুসারে বাজারে প্রচলন করা হয়। ১৯৭৮ সালে “হার্মেস (Hermès)”- এর তৎকালীন পরিচালক “জ্য লুই ডুমাস” এর সাথে হুট করেই একদিন বিমানভ্রমনে “জেন বার্কিন” এর দেখা হয়। তখন তিনি জানান তার একটু বড় ধরনের ব্যাগ পছন্দ যাতে তিনি ভ্রমনের সময় তারঁ পছন্দের জিনিস বহন করতে পারেন।সে থেকে ধারণা নিয়ে তৈরি করা হয় বিখ্যাত “বার্কিন ব্যাগ”। পরবর্তীতে “হার্মেস (Hermès)” সিল্ক স্কার্ফ বাজারে প্রচলন করে। প্রায় ৩০০ মথ পোকার সুতো ব্যবহার করা হয় একটি সিল্ক স্কার্ফ তৈরি করতে। এসব স্কার্ফে রং-বেরং এর প্রিন্ট-প্যার্টান ব্যবহার করা হয় যা ফ্যাশন জগতে অন্যতম চাহিদার বস্তু।

“হার্মেস (Hermès)” সবসময়ই প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর জোর প্রদান করে থাকে। বলা হয়ে থাকে প্রায় ৪৮ ঘন্টা সময় প্রয়োজন হয় একটি বার্কিন ব্যাগ তৈরি করতে। বার্কিন ব্যাগ তৈরির মূল উপাদান হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির সূলভ-দূর্লভ প্রাণীর চামড়া যা কিনা ফ্যাশন জগতে যথেষ্ট বির্তকের জন্ম দিয়েছে। “হার্মেস (Hermès)”-এর মোট আয়ের সর্বাধিক অর্জিত হয় চামড়ার তৈরি পণ্য থেকে যা কিনা মোট আয়ের প্রায় ৩০%। হার্মেস এর মোট আয়ের ১৫% এসে থাকে সাধারন পোশাক ও ১২% এসে থাকে স্কার্ফ থেকে। বর্তমানে আমেরিকা ও জাপান “হার্মেস (Hermès)”-এর সবচেয়ে বড় চাহিদার জায়গা।২০১৫ সালে হকংকং-এ একটি নিলামে সর্বোচ্চ দামে একটি বার্কিন ব্যাগ বিক্রী করা হয় যার মূল্য ছিল প্রায় ২২১,৮৮৪ মার্কিন ডলার। এই ব্যাগটি তৈরি করা হয়েছিল হিমালয়ান ক্রোকোডাইল এর চামড়া থেকে এবং এতে ডায়মন্ড ও ১৮ ক্যারেট গোল্ড ক্ল্যাপ্স ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রাচীনকালেও যেমন “হার্মেস (Hermès)” ছিলো সবার চেয়ে আলাদা তেমন আধুনিক সময়েও “হার্মেস (Hermès)” নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে।

আধুনিক যুগ ই-কমার্সের যুগ। পৃথিবীতে বর্তমানে অনলাইন শপিং-এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এ ব্যাপারটি হার্মেস হয়ত সবার প্রথমেই ধারণা করতে পেরেছিল। “হার্মেস (Hermès)”- ই একমাত্র ফ্যাশন ব্র‍্যান্ড যা কিনা ২০০১ সালেই অনলাইন স্টোর চালু করে। পরবর্তীতে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই অন্যান্য ফ্যাশন ব্র‍্যান্ড গুলো ই-কমার্স যুগে প্রবেশ করে। ২০১৮ সালে “দ্য দুবাই মল”-এ “হার্মেস (Hermès)” সর্ববৃহৎ ফ্যাশন বুটিক উদ্বোধন করে এবং তাদের বার্ষিক আয় প্রায় ৯.৭% বৃদ্ধি পায়। ফলে ২০১৯ সালে “হার্মেস (Hermès)” ফোর্বস ম্যাগাজিনের ফ্যাশন হাউসের তালিকায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নেয়। সফলতার মাঝেও “হার্মেস”-কে সম্মুখীন হতে হয় বিভিন্ন বির্তকের।

২০১৮ সালে ভোগ (Vouge) ম্যাগাজিনের মতে PETA অর্গানাইজেশন দাবি করে “হার্মেস (Hermès)” অবৈধভাবে কুমিরের চাষ করে থাকে। এসব কুমিরের চামড়া সংগ্রহ করার জন্যই “হার্মেস” গোপনে কুমিরের চাষ শুরু করে। পরবর্তীতে “হার্মেস”-কে শুনানির সম্মুখীন হতে হয় এবং তারা দাবি করে যে পরবর্তী থেকে তারা Animal cruelty থেকে দূরে আসবে। বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েও “হার্মেস” বিশ্বদরবারে সমাদৃত এক নাম। প্রতিনিয়ত তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েই যাচ্ছে। ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে “হার্মেস”- এর দৃষ্টিভঙ্গী। যদিও সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে “হার্মেস”- এর পণ্যসমূহ। এরপরও ফ্যাশন জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নাম “হার্মেস (Hermès)”

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​