পানামা পেপারস কেলেংকারি

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। জার্মানির দৈনিক পত্রিকা Süddeutsche Zeitung (SZ) এর সাংবাদিক বাস্তিয়ান ওবারমায়ার হঠাৎই John Doe নামের এক অচেনা ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ইমেইল পেলেন। কিন্তু মেইলের লেখা দেশে বেশ চমকেই গেলেন ওবারমায়ার। কয়েক ধাপে মোট সাড়ে এগারো মিলিয়ন ডকুমেন্ট পাঠানো হয়েছে তাকে, সব মিলিয়ে যার পরিমাণ ২.৬ টেরাবাইট! আর এই ডকুমেন্টে ছিলো বিশ্বের নামকরা সব ব্যক্তির বেনামি সম্পত্তির তথ্যের ফিরিস্তি। বিশ্বসেরা ফুটবলার থেকে বিশ্বের নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা তাদের আত্মীয়, সবারই গোমর ফাঁস করেছিলো দুনিয়া কাঁপানো এই “পানামা পেপারস” খ্যাত ডকুমেন্টগুলো। ২০১৬ সালের ৩রা এপ্রিল পুরো পৃথিবীর সামনে তা নিয়ে আসেন একদল সাংবাদিক আর দেখিয়ে দেন সকলের অগোচরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।

অচেনা ব্যক্তির মেইলে পাওয়া তথ্যের বিশালতা দেখে ওবারমায়ার বেশ ঘাবড়ে যান। SZ এর কর্তাব্যক্তিদের এই খবর জানানোর পর কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে তারা ব্যাপারটি জানান International Consortium of Investigative Journalists (ICIJ) নামক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠনকে। ICIJ এর সমন্বয়ে মোট ৮০টি দেশের প্রায় ১০৭টি মিডিয়া হাউজের বেশ ক’জন সংবাদকর্মী মিলে প্রায় ১৪ মাস সময় নিয়ে বিশাল এই তথ্যভান্ডার ঘেঁটে বের করেন গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য। আর সবশেষে একযোগে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয় এই খবর।

“পানামা পেপারস” মূলত কী?

পানামাভিত্তিক একটি আইনি প্রতিষ্ঠান “মোসাক ফনসেকা কোম্পানি”র ব্যবসায়িক ডকুমেন্টই মূলত পানামা পেপারস নামে পরিচিত। মোসাক ফনসেকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জার্গেন মোসাক ও র‍্যামন ফনসেকা। নামে আইনি প্রতিষ্ঠান হলেও মূলত মোসাক ফনসেকা বেশ কিছু অফশোর এবং শেল কোম্পানি পরিচালনা করতো, যেগুলোর নামে ব্যাংকে জমা থাকতো বিশাল অংকের টাকা। আর এসব টাকার মালিক ছিলো বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা কিংবা রাজনীতিবিদ।

কেন এই দক্ষযজ্ঞ?

আয় করলে কর দিতেই হবে, এমনটাই তো নিয়ম। কিন্তু সেই আয় যদি হয় বিশাল অংকের, তাহলে করও হবে বড় অংকের, কিন্তু কর দিতে তো রাজী নয় অনেকেই। তাছাড়া অবৈধ উৎস থেকে আসা টাকাও তো লুকিয়ে রাখতে হয় সরকারের নজর থেকে। আর এই লুকোছাপার জন্যই তৈরি করা হয় অফশোর এবং শেল কোম্পানিগুলোকে। অফশোর কোম্পানি বলতে বোঝায় বিদেশি নাগরিকের মালিকানায় এবং পরিচালনায় চলা কোম্পানি। আর শেল কোম্পানি হচ্ছে নামসর্বস্ব কোম্পানি যেগুলোর নামে শুধু রয়েছে ব্যাংক একাউন্ট, নেই কোনো অফিসের ঠিকানা বা স্থাবর সম্পত্তি। দুই ধরণেই কোম্পানিই পরিচালিত হয় এদের আইনি সহায়তা দেয়া কোনো সংস্থার মাধ্যমে এবং তাদের ঠিকানা ব্যবহার করে। মূলত এসব কোম্পানির ব্যাংক একাউন্টকেই টাকা লুকিয়ে রাখার নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর যেসব দেশে অবাধে অফশোর এবং শেল কোম্পানি চালানোর সুযোগ আছে এবং ব্যাংকে থাকা টাকার জন্যও কোন জবাবদিহি করা হয় না, তাদের বলা হয় Tax Heaven, আর পানাম হচ্ছে এমনই এক ট্যাক্স হ্যাভেন। ওদিকে মোসাক ফনসেকা ছিলো কয়েক হাজার অফশোর এবং শেল কোম্পানি পরিচালনা করা আইনি প্রতিষ্ঠান।

কী ছিলো সেই ডকুমেন্টগুলোতে?

পানামা পেপারস এর ডকুমেন্টগুলোতে থাকা তথ্য খুবই সাধারণ। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা অফশোর বা শেল কোম্পানির তালিকা আর তাদের ব্যাংক একাউন্টের যাবতীয় তথ্যই ছিলো সেখানে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সেসব ব্যক্তিরা পেলেন কোথায়, আর কেনইবা নিজের দেশে না রেখে সেগুলোকে বিদেশি ব্যাংকে রাখতে হলো? তবে কি এগুলো অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ? আর তা না হলেও কর ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে রাখা হলেও তো সেসব ব্যক্তিরা আইনের চোখে অপরাধী। এসব কারণেই পানামা পেপারসের তথ্যগুলো নিয়ে বেশ বিপদে পড়ে যান এসব ব্যক্তিরা।

কারা ছিলেন এই তালিকায়?

আগেই বলেছি বিশ্বের নামকরা প্রায় সব ব্যক্তির নামই ছিলো এই পানামা পেপারসে। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও লিওনেল মেসি থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চন, আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর বাবা, এমনকি ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহচর থেকে চীনের ক্ষমতাসীন দলের পলিটব্যুরোর বেশ কিছু সদস্য এবং বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের আত্মীয়দের নাম ছিলো এই তালিকায়। আর সবার নামেই অন্তত কয়েক বিলিয়ন করে অর্থলগ্নির ফিরিস্তি পাওয়া যায় বিভিন্ন বেনামি কোম্পানিতে। মূলত কর ফাঁকি দেয়া আর আয় সংক্রান্ত তথ্য লুকানোর জন্যই তারা বেছে নিয়েছিলেন এই পথ। পরবর্তীতে এই তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করা হয় এসব ব্যক্তির নামে। প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফ, পদ হারাতে হয় আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকেও। লিওনেল মেসিকে দিতে হয় বিশাল অংকের জরিমানা। অবশ্য অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের হওয়ায় বিভিন্নভাবে আদালতের হাত থেকে বেঁচেও যান। এই তালিকায় পুতিনের সহচর, আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট- এদেরও নাম রয়েছে। তবে সবার শাস্তি হোক বা না হোক, তথ্য গোপন করে বিশাল সম্পদের পাহাড় যে তারা গড়ে তুলেছিলেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে, এই তথ্য জনগণের সামনে নিয়ে আসাই ছিলো পানামা পেপারসের সফলতা।

বাংলাদেশি ব্যক্তির নাম

অবাক করার মত ব্যাপার হলো, পানামা পেপারসে বেশ কিছু বাংলাদেশি ব্যক্তির নামও ছিলো। যদিও এসব ব্যক্তিরা দেশের উচ্চপদস্থ কেউ নন, তারা কারো আত্মীয় কিনা এ ব্যাপারেও নিশ্চিত তথ্য নেই। কিন্তু প্রভাবশালী না হওয়া সত্ত্বেও সরকার কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়নি এটি এখনো ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে।

মোট ৩২টি দেশের সরকারি ব্যক্তিত্ব এবং তাদের আত্মীয়দের তথ্য ফাঁস করে দেয়া এই পানামা পেপারস এসেছিলো যার হাত থেকে, সেই John Doe এর পরিচয় কখনোই পাওয়া যায়নি। সেই ব্যক্তি এই তথ্যের বিনিময়ে কোনো অর্থই দাবী করেননি। তিনি মেইলে বলেছিলেন তিনি শুধু চান এই বিশাল দুর্নীতির তথ্য যেন ফাঁস হয়। সব ঘটেছেও তার চাওয়া মতই। আজ ৪ বছর পরে এসেও এখনো গবেষণা চলছে পানামা পেপারসের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে। হয়ত সামনে বেরিয়ে আসবে আরো অনেক তথ্য। পানামা পেপারসের মত বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আরো কিছু তথ্য ফাঁসের ঘটনা জানতে থাকুন টিম চকবোর্ডের সাথেই।  

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​