বিজ্ঞান ও আবিষ্কার: কম্পাস

একটা সময় ছিল, যখন মানুষের নেশা ছিল ভ্রমণের মাধ্যমে নতুন দ্বীপ, সমতল কিংবা নতুন দেশ আবিষ্কার করা। তারপর সেই নতুন দেশে বসতি স্থাপন করা বা বাণিজ্য করা। কিন্তু নতুন জায়গার আবিষ্কারে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতো উত্তাল সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া। কারণ সমুদ্রে দিক নির্ণয় করা বেশ কঠিন। তাই সহজে পথ খুঁজে পেতেই আবিষ্কার হয় কম্পাসের।

দিক নির্ধারণের জন্য মানুষ কম্পাসের আগে আকাশের তারা, মাটির কোনো চিহ্ন, পরিযায়ী পাখি ও স্রোতের সাহায্য নিতো। কিন্তু কোনোটাই চিরন্তন সত্য ছিল না। আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে, খ্রীস্টপূর্ব ৩০০ থেকে ২০০ সালের মধ্যে কম্পাস আবিষ্কৃত হয় চীনের হান রাজবংশের (Han dynasty) হাত ধরে। তবে তা দিক নির্ধারণের জন্য ছিল না। প্রথম দিকে কম্পাসের ব্যবহার হতো ভাগ্য গণণায় ও চীনা ঐতিহ্যবাহী ভূতাত্ত্বিক অনুশীলনে, যার নাম ‘Feng Shui’। প্রথম কম্পাসগুলো ছিল ‘Lodestone’ (প্রাকৃতিক চুম্বকায়িত খনিজ পদার্থ) দ্বারা তৈরি। চীনাদের কাছে এটা ছিল অতিপ্রাকৃত (Supernatural) বস্তু। ভবন নির্মাণ, খনির আবিষ্কার ও খনন কাজে দিক নির্ধারণ, যেকোনো অবস্থানে দিক নির্ধারণের জন্য কম্পাসের ব্যবহার শুরু হয় ১০৫০ সালের দিকে।

১১ শতকের শুরুতে চীনের সং রাজবংশ (Song dynasty) তাদের মিলিটারিদের জন্য দিক নির্ধারণে কম্পাস ব্যবহার করতো। ১২ শতকে ডেনমার্কে ভবনের ও চার্চের নকশা তৈরিতেও কম্পাস ব্যবহার করা হয়েছিল। তখনকার কম্পাসগুলো দেখতে পানিতে ভাসমান ‘দক্ষিন মুখী একটা মাছ’ এর মতো ছিল। কয়েক দশক পরে আবির্ভাব হয় Lodestone দ্বারা চুম্বকায়িত লোহার শলাকা কম্পাস। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আসে এখনো পর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত তরলে পূর্ণ চুম্বকের কম্পাস৷ এই কম্পাসে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র শলাকার উপর টর্ক সৃষ্টি করায় শলাকার উত্তর প্রান্ত পৃথিবীর উত্তর মেরু ও শলাকার অপর প্রান্ত পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর দিকে নির্দেশ করে অবস্থান করে।

১২০০ সালে ইউরোপে কম্পাসের আবির্ভাব ঘটে Alexander Neckam (১১৫৭-১২১৭) এর মাধ্যমে। ১৩ শতকে চুুুম্বক ব্যবহার হয়েছিল পৃৃথিবীর মধ্যরেখা নির্ধারণ ও মানচিত্র নির্মাণে। ১৪ শতকে সিরিয়ার এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও সময়রক্ষক ইবন আল সাতির (১৩০৪-১৩৭৫) একটি যন্ত্র তৈরি করেন যাতে সূর্যঘড়ি ও চুম্বকীয় কম্পাস একসাথে যুক্ত ছিল। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধেও কম্পাসের ব্যবহার হয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যকে বেগবান করতে এই কম্পাসের ভূমিকা কম নয়। ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জনগণের মধ্যে কম্পাসের আধুনিক রূপ GPS নিয়ে আসে। তাই এর আওতায় থাকা মানুষগুলো সহজে হারিয়ে যেতে পারে না।

বর্তমানে বিমান, সাবমেরিন, মুঠোফোন ও হাতঘড়িতে দিক নির্ধারণে কম্পাস ব্যবহৃত হচ্ছে। কম্পাস আবিষ্কারকে চীনের অভূতপূর্ব ৪টি আবিষ্কারের মধ্যে একটি বলে গণ্য করা হয়। এর আবিষ্কার পৃথিবীর এমন সব স্থানে মানুষকে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে যেখানে কম্পাস না থাকলে মানুষের মনে হতো এই বুঝি পৃথিবীর শেষ।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​