বিজ্ঞান ও আবিষ্কার: কম্পিউটার

আমরা যারা বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থী, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী এমনকি শিক্ষোপকরণ হিসেবে যে যন্ত্রটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি তা হলো কম্পিউটার । এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে, যে বিষয় সম্পর্কে জানাটা রীতিমতো আবশ্যক, সেটাও কিন্তু এই কম্পিউটার । শত বিজ্ঞানীর হাজারো প্রয়াসে প্রযুক্তির অভিনব উন্নতির ফলে ঘটা কম্পিউটারের এই ক্রমবিকাশ আমাদের জীবনকে নিয়ে গেছে অন্য মাত্রায় ।

শুরু করা যাক একদম গোড়া থেকে । কম্পিউটার তৈরির প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো বড় বড় সংখ্যা গণনা করা । চীনে খ্রীষ্টপূর্ব ২৪০০ সাল থেকে বিভিন্ন সধারণ গাণিতিক প্রক্রিয়াগুলো করার জন্য বিডস আর রডের তৈরি অ্যাবাকাস ব্যবহৃত হতো । আর এটাই ছিল পৃথিবীর সর্বপ্রথম কম্পিউটার । ১৬১৬-’১৭ সালে স্কটিশ গণিতবিদ আবিষ্কার করেন হস্তচালিত যন্ত্র যাতে ৯টি রডের প্রত্যেকটিতে ১-৯ পর্যন্ত অংক লেখা ও ‘০’ এর জন্য একটা ধ্রুবক রড ছিল । এই যন্ত্রে দুটো বড় সংখ্যা গুন করা যেত। ১৬২০-৩০ সালে William Oughtred নেপিয়ারের নীতির উপর ভিত্তি করে তৈরি করেন Slide Rule যন্ত্র যার সাহায্যে গুণ, ভাগ, বর্গমূল করা যেত। ১৬৪২ সালে Blaise Pascal আবিষ্কার করেন প্রথম ঘূর্ণন চাকা সম্বলিত ক্যালকুলেটর ‘Pascal’s calculator’ যা দিয়ে চার সারির সংখ্যার যোগ, বিয়োগ, গুন, ভাগ করা যেত।

১৬৭১ সালে Gottfried Leibniz তাঁর আবিষ্কৃত Binary system (এমন একটি ভাষা যা মানুষ ও যন্ত্র উভয়েই বুঝতে পারে) এর সাহায্যে তৈরি করেন প্রথম মেকানিক্যাল কম্পিউটার ‘Stepped Reckner’। ১৮০১-‘০৪ সালে Joseph Jacquard আবিষ্কার করেন পাঞ্চড কার্ড ব্যবহৃত প্রথম কম্পিউটার ‘Jacquard Loom’। ১৮২২ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ Charles Babbage তৈরি করেন ‘Difference Engine’ যেখানে প্রথম তথ্য সঞ্চয় করা ও অনেক গুলো গণনা একসাথে করা যেত। ১৮৩১-৩৪ সালে Babbage তৈরি করেন ‘Analytical Engine’ যাতে প্রথম ‘Input-Process-Output’ এই ধারণাটি পাওয়া যায় তবে এর আধুনিকায়নে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন।এই কম্পিউটারের প্রোগ্রাম লিখেছিলেন Ada Lovelace। তাঁর কম্পিউটারের ধারণা থেকেই বর্তমান আধুনিক কম্পিউটারগুলো তৈরি হয়েছে। এ কারণেই তাঁকে কম্পিউটারের জনক বলা হয়। ১৮৭২ সালে প্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার তৈরি করেন Sir William Thomson। ১৮৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের করা আদমশুমারির ফলাফল দিতেই লেগে যায় ৭ বছর। তাই এই কাজের জন্য ১৮৯০ সালে পাঞ্চড কার্ডে নির্মিত সয়ংক্রিয় ‘Hollerith Tabulator’ তৈরি করেন Hermann Hollerith। এরপর থেকে যে কম্পিউটার গুলো আবিষ্কৃত হয় সেগুলোকে প্রজন্মের (Generation) ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে।

প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারে (১৯৪০-‘৫৬) গণনার জন্য ভ্যাকুয়াম টিউব ও স্মৃতি ধারণের জন্য চুম্বকীয় ড্রাম ব্যবহৃত হত এবং এগুলো একবারে একটি করে সমস্যার সমাধান করতে পারতো। এদের মধ্যে রয়েছে ১৯৪১ সালে জার্মান উদ্ভাবক Konrad Zuse এর আবিষ্কৃত Z3 নামে সম্পূর্ণ সয়ংক্রিয় প্রথম কার্যকর ইলেকট্রো-মেকানিকেল প্রোগ্রামের রিলে কম্পিউটার,১৯৪৪ সালে Howard Eaycan এর Binary syatem এর উপর ভিত্তি করে তৈরি এক ঘর সমান ‘Mark-1’, ১৯৪৬ সালে John Muchly ও Presper Eckert এর প্রথম সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক কম্পিউটার ‘Univac’। এই সময় Grace Hopper কম্পিউটারের ভাষা ‘COBOL’ তৈরি করেন।

১৯৫৬-‘৬৩ সালের দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটারে ভ্যাকুয়াম টিউবের বদলে ট্রানজিস্টর, ইনপুটের জন্য পাঞ্চড কার্ড ও আউটপুটের জন্য প্রিন্টআউট ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় IBM কর্তৃক FORTRAN ( FORmula TRANslation) ভাষা তৈরি হয়। তৃতীয় প্রজন্মের কম্পিউটারে (১৯৬৪- ‘৭১) ‘Integrated circuit’ ব্যবহৃত হয় যেখানে ছোট আকারের ট্রানজিস্টর তৈরি করে সিলিকন চিপের উপর বসানো হয়েছিল। এতে কম্পিউটারের গতি ও কার্যক্ষমতা উভয়ই বেড়ে গিয়েছিল এবং একই সময়ে একাধিক সমস্যা সমাধান করতে পারতো।এই কম্পিউটারে ব্যবহৃত হতো C ভাষা। ১৯৭১ থেকে বর্তমান পর্যন্ত তৈরি হওয়া কম্পিউটার গুলো হয়ে ওঠে আরো ছোট কারণ মাইক্রো প্রসেসর এর মাধ্যমে একটি চিপে হাজারটি ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বসানো সম্ভব হয়েছে। আর এই ছোট কম্পিউটারগুলো এতোটাই শক্তিশালী যে এক একটি ডিভাইস ও কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করে নেটওয়ার্ক গঠন করা সম্ভব হয়েছে। এখন আসছে পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার যাতে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

এই আধুনিক কম্পিউটার ব্যবহার করে যেমন তৈরি করা হচ্ছে জটিল গ্রাফিক্সের সিনেমা, থ্রিডি এনিমেশন, ভিডিও গেমস তেমনি ব্যবহৃত হচ্ছে পড়াশোনা, ব্যবসা, বড় কারখানা, যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ট্র‍্যাকিং, নেভিগেশন, মহাকাশযান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। আর দরজায় কড়া নাড়ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার যেটা করতে পারবে বিশাল বিশাল গাণিতিক সমস্যার সমাধান, ক্রিপ্টোগ্রাফি বা কম্পিউটার এনক্রিপশন তথা কম্পিউটারের নিরাপত্তায় আসবে বড় পরিবর্তন, চিকিৎসা ও ঔষধ শিল্পে এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আসলে আগামী দিনের অত্যাধুনিক কম্পিউটারের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ঠিক কি কি করা যাবে, আমরা এখনও তা জানি না। আর এটাই এক ধরণের বিস্ময়কর ব্যাপার। এই না জানাটাই যেন একধরনের আনন্দের বিষয়, যেন আগে থেকেই অপেক্ষা করে আছি বড় কোনো চমকের!

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​