বিজ্ঞান ও আবিষ্কার: রকেট

মহাকাশে পদচারণ আধুনিক পৃথিবীর মানুষের জন্য নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সায়েন্স ফিকশনধর্মী সাহিত্য এবং বর্তমান বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার বদৌলতে আমরা চায়ের আড্ডাতেও আলোচনা করি মহাকাশে বসতি গড়া নিয়ে কিংবা ভিন গ্রহের প্রাণীদের সাথে আলাপ করার ব্যাপারে। আর যে আবিষ্কারের কারণে আমরা এমন চিন্তা করতে পারি, সেটা হলো রকেট।

বিশ্বাস করা কঠিন হলেও, রকেটের ইতিহাস আসলে অনেক পুরনো। খ্রীস্টপূর্ব ৯০৪ সালে প্রথম চীনে রকেট দেখা যায়। শুরুতে সেটা উৎসবের একটা অংশ হিসেবে আতসবাজি ফোটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। তবে ১২৪১ সালে যুদ্ধে রকেট স্বরূপ অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। ১২৭০-‘৮০ সালে হাসান আল রামাহের লিখিত অস্ত্র সংক্রান্ত বইয়ের ১০৭ টি বারুদ তৈরির রেসিপির মধ্যে ২২ টি ছিল রকেট কে ব্যবহার করে। ১৪ শতকের মাঝামাঝিতে এসে ভারত, কোরিয়া, ইউরোপ রকেটকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফিকশন লেখক Jules Verne ও H. G. Wells এর অনুপ্রেরণায় রকেটকে মহাকাশ গবেষণার সাথে যুক্ত করতে সংঘবদ্ধ হন বিজ্ঞানীরা। ১৯০৩ সালে রাশিয়ান পদার্থবিদ Konstantin Tsiolkovsky মহাকাশ ভ্রমণে সক্ষম রকেট বিজ্ঞানের উন্মোচন ঘটান, যে বিজ্ঞানের ভিত্তি হলো নিউটনের গতির তিনটি সূত্র। ১৯১২ সালে Tsiolkovsky এর রকেট সমীকরণ প্রমাণ করে Robert Esnault-Pelterie রকেট তত্ত্ব ও গ্রহের মধ্যকার ভ্রমণ সম্পর্কে আরো তথ্য দেন। একই বছর, Robert Goddard রকেট নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণের পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, উচ্চ চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন তরল জ্বালানির প্রপেলেন্ট কন্টেইনার ব্যবহার করলে, রকেট বিভিন্ন ধাপে খন্ডিত থাকলে, ‘de laval (supersonic) nozzle’ ব্যবহার করে শব্দের গতির ঊর্ধ্বে গেলে রকেটের কার্যকরীতা ২% থেকে ৬৩% বৃদ্ধি সম্ভব হবে।

১৯১৪ সালে তিনি তরল জ্বালানি ও দুই স্টেজের রকেটের পেটেন্ট অর্জন করেন। ১৯২৬ সালের ১৬ মার্চ তিনি প্রথম আধুনিক রকেট উৎক্ষেপণ করেন। সেই রকেট অবশ্য মহাকাশে না গিয়ে, পড়েছিল একটা বাঁধাকপি ক্ষেতে। কিন্তু রকেট বিজ্ঞান এরপরে কখনোই থেমে যায়নি। ১৯৩১-‘৩৭ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন রকেট শিল্পকে সরকারের তত্ত্বাবধানে আনার প্রচেষ্টা চালায়।

১ম ও ২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় এই রকেটকে অবশ্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চালানো হয়। এই রকেটের মধ্যে জার্মানির V-2 রকেট অন্যতম। যুদ্ধ শেষে সকল V-2 রকেট আটক করে মহাকাশে পাঠানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর, সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী প্রথম কৃত্রিম স্যাটেলাইট, স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন লাইকা নামের কুকুরকে মহাকাশে পাঠায়। আর Yuri Gagarin ছিলেন মহাকাশে পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী প্রথম মানব। ১৯৫৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ও ৪ অক্টোবর পাঠানো Luna-2, Luna-3 চাঁদ প্রদক্ষিণ ও ছবি তুলে পাঠাতে সক্ষম হয়।

অপরদিকে ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত National Advisory Committee for Aeronautics (NACA) পরিবর্তিত হয় National Aeronautics and Space Administration (NASA) যার মূল উদ্দেশ্য হলো মানব কল্যাণে শান্তিপূর্ণ মহাকাশ গবেষণায় রকেটের ব্যবহার। ১৯৬৯ সালে নাসার Apollo-11 রকেটে করে চাঁদে প্রথমবারের মতো পা রাখেন নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অলড্রিন। ১৯৮১ সালে শুরু হয় NASA Space Shuttle Program যেখানে পুনরায় ব্যবহার যোগ্য রকেটের জন্য Space Transportation System চালু হয়, যাকে আমরা Space Shuttle বলে জানি। ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০ বছরে space shuttle এর মাধ্যমের ১৩৫ টি মিশন সম্পন্ন হয়েছে। আর NASA -র এখন পর্যন্ত চলমান মিশনের সংখ্যা ৬৯। আর ভয়েজার-২ পৌঁছে গেছে সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক স্থানে।

কিন্তু ভীষণ ব্যয়বহুল এই রকেট উৎক্ষেপণকে অসম্ভব রকমের সস্তা বানিয়ে ফেলেছে যে কোম্পানি সেটা হলো ২০০২ সালে ইলেকট্রিক গাড়ি কোম্পানি-টেসলার প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠিত SpaceX। তারা রকেট উৎক্ষেপণের খরচ পাঁচ গুণেরও বেশি কমিয়ে এনেছে এবং একই রকেট বারবার ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছে। রকেটের বিভিন্ন অংশ নিজেরাই তৈরি করে ২০০৬ সালে ফ্যালকন-১ উৎক্ষেপণ করে যা ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৫ বার উৎক্ষেপিত হয়েছে। ২০১০ সালে উৎক্ষেপণ করা ফ্যালকন-৯ ২০১৫ সাল পর্যন্ত ২০ বারের মতো উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে ৪র্থ শক্তিশালী ও ফাংশনাল সব রকেটের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট ফ্যালকন হেভি ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়।

মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার স্বপ্ন, ইতিবাচক চিন্তাশক্তি ও অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছা। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। আর সেজন্যই রকেট এখন যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে নয়, মহাবিশ্বের অজানাকে জানার এবং মানব সভ্যতা রক্ষা ও প্রয়োজনে ভিনগ্রহে বসতি গড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​