বিজ্ঞান ও আবিষ্কার: স্টেথোস্কোপ

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের একটা তালিকা তৈরি করলে, ডাক্তাররা যে তালিকার উপরের দিকেই থাকবে সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ডাক্তার বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা অ্যাপ্রন পরা , গলায় বা হাতে স্টেথোস্কোপ ঝোলানো একটা মানুষ। এমনটা নয় যে, সব ধরনের চিকিৎসা শাস্ত্রে স্টেথোস্কোপ লাগে, কিন্তু তারপরও স্টেথোস্কোপ ছাড়া ডাক্তারকে যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই আবিষ্কার, স্টেথোস্কোপের পেছনের ইতিহাসটা একটু ভিন্নই বটে।

আমাদের দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ, বিশেষ করে হৃৎপিন্ড ও ফুসফুস থেকে বিভিন্ন রকম শব্দ বের হয়। এই শব্দ শুনে ডাক্তাররা বুঝতে পারেন কোনো সমস্যা আছে কিনা। শরীরের শব্দ শুনে রোগ নির্ণয়ের এই হাজার বছরের পুরনো পদ্ধতির নাম হলো Auscultation। আর স্টেথোস্কোপের কাজটা হলো হৃৎপিন্ড ও ফুসফুসের শব্দ শোনা।

উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত ডাক্তাররা এই শব্দ শোনার কাজটা করতেন রোগীর বুকে কান লাগিয়ে। ১৮১৬ সালের একদিন প্যারিসের নেকার হাসপাতালের ডাক্তার René Theophile Hyacinthe Laënnec (১৭৮১-১৮২৬) বিপদে পড়লেন এক তরুণী রোগীকে নিয়ে। প্রথমত, রোগীর শারীরিক আয়তন বিশাল হওয়ায় যে শব্দ শোনা গেল তা দিয়ে রোগ নির্ণয় করা গেলো না, দ্বিতীয়ত, রোগীর গায়ের গন্ধে কাছেই যাওয়া দায়, তার উপর তখন ইউরোপে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব। কী করবেন ভাবতে ভাবতেই তিনি দুটো বাচ্চা ছেলেকে কাঠ নিয়ে খেলতে দেখে হঠাৎ চিন্তা করেন কাঠের ভেতর দিয়ে শব্দের বেগ, বাতাস ও পানিতে শব্দের বেগের চেয়ে বেশি। ডাক্তার লাইনেক দ্রুত ওয়ার্ডে গিয়ে হাতে থাকা মেডিকেল জার্নালটাকে গুটিয়ে চোঙার মতো করে এক প্রান্ত এক রোগীর বুকে অন্য প্রান্ত কানে লাগিয়ে দেখেন, স্পষ্ট ও জোড়ালো শব্দ শোনা যাচ্ছে। ডাক্তার লাইনেকের সেই ‘ইউরেকা’ মুহূর্তেই জন্ম হয় প্রথম স্টেথোস্কোপের। ডাক্তার লাইনেক, তাঁর আবিষ্কার কাঠের সিলিন্ডারটির নামকরণ করেন স্টেথোস্কোপ, যা ‘স্টেথোস’ (অর্থ বুক) আর ‘স্কোপেইন’ (অর্থ খুঁজে দেখা) শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। তিনটি বছর নানা পরীক্ষা করে তিনি দেখেন ২৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ ও সাড়ে ৩ সেন্টিমিটার ব্যাসের ফাঁপা কাঠের সিলিন্ডারের স্টেথোস্কোপ সবচেয়ে ভালো কাজ করে।

১৮১৯ সালে স্টেথোস্কোপ দিয়ে বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের তথ্য নিয়ে তাঁর লেখা বই হয়ে ওঠে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাইলফলক। ১৮২৮ সালে সিলিন্ডারের একদিক চোঙ্গাকৃতির ও অপরদিক সরু করা হলো যাতে রোগীর দেহ থেকে বেশি শব্দ আসে এবং শব্দ অন্য শব্দের সাথে মিশে না যায়। ১৮৪৩ সালে সিলিন্ডারের এক প্রান্তে সীসার নল লাগিয়ে দুই কানে শোনার ব্যবস্থা করা হলো। ১৮৫৫ সালে রাবারের ব্যবহারে স্টেথোস্কোপের গঠনে আসে বিশাল পরিবর্তন। ১৮৯৪ সালে স্টেথোস্কোপে শক্ত ধাতব ডায়াফ্রাম যুক্ত করা হয়, এর নাম দেয়া হয় ফোনেন্ডোস্কোপ। ১৯২৬ সালে স্টেথোস্কোপে বেল ও ডায়াফ্রাম যুক্ত করেন বোস্টনের বক্ষব্যাধিবিশেষজ্ঞ হাওয়ার্ড স্প্র‍্যাগ যাতে ডাক্তার কম ও বেশি কম্পাংকের শব্দ শুনতে পান।

বর্তমানে যে স্টেথোস্কোপ আমরা দেখি, তার চেস্ট পিসে বড় চাকতির ন্যায় ডায়াফ্রাম ও তার সাথে যুক্ত ছোট আকৃতির ফাঁপা বেল থাকে। ডাক্তারের শ্রবণশক্তির উপর নির্ভর করে রোগ নির্ণয় করা হয়, আর এটাই স্টেথোস্কোপের বড় দুর্বলতা। সেজন্যই ডিজিটাল প্রযুক্তিতে উন্নত পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল স্টেথোস্কোপের দিকে। ডিজিটাল স্টেথোস্কোপ শব্দকে ইলেকট্রনিক সিগনালে রূপান্তর করে নানা ভাবে প্রসেস করতে পারবে ডায়াফ্রাম ও বেলের সাথে যুক্ত থাকা তিনটি মডিউলের (ডেটা অ্যাকুইজিশন বা তথ্য সংগ্রহ, প্রি-প্রসেসিং এবং সিগনাল প্রসেসিং) সাহায্যে। হৃৎপিন্ডের সঠিক শব্দ শুনেই হৃদরোগের পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হবে এবার।

পৃথিবীতে প্রতি বছর মৃত্যু বরণ করা মানুষদের মধ্যে ৩১% হলো হৃদরোগী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর কারণ রোগ নির্ণয় করতে না পারা বা দেরিতে নির্ণয় করা। সেক্ষেত্রে স্টেথোস্কোপের আধুনিকীকরন করা হলে মানুষের রোগ নির্ণয় আরো দ্রুত ও সঠিক হবে। আর জন্মলগ্ন থেকে কোনো ক্লান্তি ছাড়াই দিনে লক্ষ বার রক্ত পাম্প করে যাওয়া এই হৃদযন্ত্রটার প্রতি একটু যত্নশীল হওয়া সম্ভব হবে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​