বিজ্ঞান ও আবিষ্কার: বৈদ্যুতিক বাতি

আমাদের পৃথিবীকে আমরা একেকজন একেকভাবে কল্পনা করতে পছন্দ করি। কিন্তু যেভাবে আমরা কল্পনা করি না বা করতে চাই না সেটা হলো ঝলমলে আলোহীন পৃথিবী। নির্দিষ্ট করে বললে, বলা যায় বৈদ্যুতিক বাতি ছাড়া পৃথিবী। আর এই বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের ইতিহাসটাও খুব বেশি সময়ের নয়। অনেক উদ্ভাবকের অবদান সমৃদ্ধ নানা ঘটনাবহুল ঠিক ২২০ বছরের ইতিহাস।

১৮ শতকে কৃত্রিম আলোর প্রয়োজনে মানব সভ্যতা মোমবাতি ও তেলের প্রদীপ ব্যবহার শুরু করে। ১৯ শতকের শুরুতে মানুষ বিদ্যুৎ সম্পর্কে জানতে পারে এবং বুঝতে শুরু করে কিভাবে এই বিদ্যুৎকে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহার করা যায়। ১৮০৭ – ‘১০ সালের মধ্যে লন্ডন শহরসহ আরো বেশ কিছু শহরের কয়েকটি জায়গায় William Murdoch এর আবিষ্কৃত তেলের গ্যাস ল্যাম্প ব্যবহার শুরু হয়। অপরদিকে ১৮০০ সালে ইটালিয়ান রসায়নবিদ Alessandro Volta (১৭৪৫-১৮২৭) জিংক ও কপার দন্ড ব্যবহার করে ইলেকট্রিক ব্যাটারি তৈরি করেন, যার নাম দেন ‘Voltaic Pile ‘। তার ঠিক ২ বছর পরে, ১৮০২ সালে ইংল্যান্ডের Sir Humphrey Davy (১৭৭৪-১৮২৯) কার্বন রড ব্যবহার করে ইলেকট্রিক আর্ক ল্যাম্প তৈরি করেন।

আসলে Davy ছিলেন প্রথম কৃত্রিম ইলেকট্রিক আলোর আবিষ্কারক। তখন শক্তির উৎস বা Power source বলতে ছিলো সেই কম শক্তিসম্পন্ন Voltaic pile ব্যাটারি। ১৮৩১ সালে Humphrey Davy-র এক সহকারি মাইকেল ফ্যারাডে বিদ্যুত-চৌম্বকীয় আবেশ আবিষ্কার করেন ও জেনারেটর তৈরি করতে সক্ষম হন। এবার আর ইলেকট্রিক বাতি তৈরিতে পাওয়ারের ঘাটতি না থাকায়, ফ্যারাডের আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করেই Davy তৈরি করেন তাঁর প্রথম ব্যবহারিক ইলেকট্রিক ল্যাম্প । কিন্তু নতুন করে দেখা দেয় তাড়াতাড়ি ল্যাম্প পুড়ে যাওয়া ও নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যা । এছাড়া এগুলো এতোটাই উজ্জ্বল ছিলো যে সেগুলোকে ঘরের বদলে স্ট্রীট ল্যাম্প হিসেবেই শুধু ব্যবহার করা যেত । ১৮৪০ সালে রসায়নবিদ Warren De La Rue ( ১৮১৫-১৮৮৯) প্লাটিনাম ফিলামেন্ট ব্যবহার ইলেকট্রিক বাল্ব তৈরি করেন । কিন্তু এই বাল্ব ছিলো অনেক ব্যয়বহুল ।

১৮৫০ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিদ, রসায়নবিদ ও উদ্ভাবক Sir Joseph Wilson Swan (১৮২৮-১৯১৪) কার্বন রড বা কার্বোনাইজড ফিলামেন্ট দিয়ে বৈদ্যুতিক বাল্ব তৈরি করেন । এগুলোকে বলা হতো ‘Incandescent carbon lamp’ , যেখানে ফিলামেন্টকে ততক্ষণ পর্যন্ত উত্তপ্ত করা যতক্ষণ না পর্যন্ত তা জ্বলে উঠছে । কিন্তু ভালো ভ্যাকুয়াম না থাকায় এই ল্যাম্প স্থায়ী হচ্ছিল না । ১৮৬৫ সালে জার্মান রসায়নবিদ Hermann Sprengel আবিষ্কার করেন Sprengel pump, যার সাহায্যে বাল্বের ভেতরের বাতাস সরিয়ে ফিলামেন্ট পুড়ে যাওয়ার হাত থকে রক্ষা করা যেত । ১৮৭৮ সালে Joseph Swan এই পাম্পের সাহায্যে বাল্ব তৈরিতে সমর্থ হন । তখন আবার দেখা যায় যে, ফিলামেন্ট অনেক কম রোধসম্পন্ন হওয়ায় অনেক বিদ্যুৎ খরচ হতো । ১৮৮০ সালে Swan বাল্ব তৈরি করেন ‘Cotton thread’ দিয়ে, আর এই বাল্বের পেটেন্টও তিনি অর্জন করেন । তার আগে ১৮৭৪ সালে Henry Woodward ও Mathew Evans একত্রে নাইট্রোজেন গ্যাস ভর্তি বাল্ব তৈরি করেন যাতে বিভিন্ন আকারের কার্বন দন্ড ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়েছিলো । কিন্তু ভালো প্রচার না পাওয়ায় তারা বিজ্ঞানী Thomas Alva Edison এর কাছে বিক্রি করে দেন।

১৮৭৮-‘৮০ সালের মধ্যে Thomas Edison ৩০০০ এরও বেশি বাল্বের নকশা করেন । যেহেতু বেশিক্ষণ ধরে জ্বলার জন্য বাল্বের উচ্চ রোধসম্পন্ন ফিলামেন্ট দরকার ,তাই তিনি বারবার পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিলেন । তিনি ৬০০০ এর বেশি গাছের পাতা এমনকি তার সহকারিদের চুল, দাঁড়িও ফিলামেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে দেখেছেন । ১৮৭৯ সালে তিনি কার্বোনাইজড বাঁশের ফিলামেন্ট দিয়ে যে বাল্ব তৈরি করেন তা ১২০০ ঘণ্টা পর্যন্ত আলো দেয়েছিলো । এই বাল্বের পেটেন্ট তিনি অর্জন করেন। পরে Edison তারঁ বাল্ব চুরির অভিযোগ আনেন Swan এর বিরূদ্‌ধে । এর উত্তরে Swan তার গবেষণা প্রমাণ করে দেখান । পরবর্তীতে তাঁরা দুজনে স্থাপন করেন ‘Edison & Swan Electric Light Company’ । ১৯০৪ সালে Edison টাংস্টেন ফিলামেন্ট দিয়ে তৈরি করেন Incandescent bulb। আবিষ্কৃত হয় সর্বাধুনিক বৈদ্যুতিক বাল্ব।

১৯০১ সালে Peter Cooper তাঁর ‘Low pressure mercury vapor lamp’ এবং Edmund Germer তাঁর ‘High pressure vapor lamp’ এর পেটেন্ট অর্জন করেন, যেগুলো ‘Fluorescent light’ নামে জানি আমরা । ১৯৭৬ সালে Edward E. Hammer বর্তমানে সর্বাধিক ব্যবহৃত CFL (Compact Fluorescent light) বা LED Bulb আবিষ্কার করেন । Edison এর আবিষ্কৃত ১৩০০ ডিভাইসের মধ্যে বৈদ্যুতিক বাল্ব ছিলো একটি । বাল্ব নয়, বরং বাল্বের একটি যুগান্তকারী নকশা প্রবর্তন করে বৈদ্যুতিক বাল্বকে ল্যাবরেটরি থেকে ঘরে পৌছে দিয়েছেন বলেই তিনি আখ্যায়িত হয়েছেন আধুনিক বাল্বের জনক হিসেবে । আর আমরা সাক্ষী হয়েছি বৈদ্যুতিক বাল্বের গতিময় বিবর্তনের।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​