বিজ্ঞান ও আবিষ্কার: ভ্যাক্সিন

সম্প্রতি বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে আখ্যা পাওয়া COVID-19 (করোনা ভাইরাস) মানবগোষ্ঠীকে এতটা অসহায় ও আতংকিত করে তোলার মূল কারণ হলো, এর সঠিক কোনো প্রতিকার ব্যবস্থা না থাকা। এখন এ রোগ প্রতিরোধে আপ্রাণ চেষ্টা চলছে প্রতিষেধক টিকা তৈরির।

১৯ শতকের আগ পর্যন্ত, বিশ্বে এমন মহামারী রোগ আরো বেশি ছিল। কারণ মানুষের কাছে ছিল প্রতিষেধক টিকা বা ভ্যাক্সিন। টিকার গোড়াপত্তন ঘটে প্রাচীন এশিয়া ও আফ্রিকায়। যেটাকে আমরা টিকা বলছি, তার প্রথম ভার্সন এসেছিল গুটি বসন্ত (Small Pox) মোকাবেলা করতে। গুটি বসন্ত এমন এক রোগ ছিল যেটা ধনী- গরিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতো না। শুধু ইউরোপেই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে ৪ লক্ষাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল। তবে ব্যতিক্রম ছিল গরুর দুধ দোহনকারীরা। তারা একে তো গুটি বসন্তে আক্রান্ত হতো না এমনকি সুস্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের অধিকারীও ছিল। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার দেখেন, দুধ দোহনকারীদের খুব দুর্বল বসন্ত হয়। তবে সেটা দুর্বল গরুর বসন্ত (Cowpox)। জেনার ধারণা করেন, গরুর বসন্ত, গুটি বসন্তের সাথে সম্পর্কিত এবং দুর্বলটির জিন, শক্তিশালী লিথাল জিনকে দমনে সক্ষম। তাঁর এই ধারণার সত্যতা যাচাইয়ে, ১৭৯৬ সালে ৮ বছর বয়সী একটি ছেলের দেহে গরুর বসন্তের পুঁজ ইঞ্জেক্ট করেন। ছেলেটি খুব দুর্বল বসন্ত হয় আবার দ্রুত সেরে উঠে। পরবর্তীতে গুটি বসন্তের সংস্পর্শে আসলেও সে অসুস্থ হয় নি।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune system) বৃদ্ধির এই পদ্ধতিটি জেনারের পরীক্ষার আগে চীনে প্রচলিত ছিল ‘Variolation’ নামে। জেনার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করার পর, ল্যাটিন ‘Vacca’ (অর্থ গরু) ও ‘Vaccinia’ (অর্থ গরু বসন্ত) থেকে নামকরণ করেন ‘Vaccine’। যদিও জেনার জানতেন না এটা কিভাবে সম্ভব হলো। মূলত প্যাথোজেন (রোগ সৃষ্টিকারী উপাদান) বা জীবাণুকে মেরে ফেলে বা দুর্বল করে ফেলে দেহে প্রবেশ করানো হয়, যাতে দেহে তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সৈন্য (এন্টিবডি) তৈরি করে স্মৃতিকোষে সংরক্ষণ করে রাখতে পারে এবং সময় মতো রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে। অর্থাৎ অভিযোজিত ইমিউন সিস্টেম অর্জন করতে পারে।

১৭৯৮ সালে আবিষ্কৃত এই টিকা বিভিন্ন প্রক্রিয়াকরণের পর ১৯৭৯ সাল থেকে সারা বিশ্বে প্রচলিত হয়। লুই পাস্তুরের গবেষণায়, কলেরা (১৮৯৭ সাল) ও অ্যানথ্রাক্স (১৯০৪ সাল) এর টিকা আবিস্কৃত হয়। ১৮৯০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে তৈরি হয় BCG টিকা। ১৯২৩ সালে আলেকজান্ডার গ্লেনি যক্ষার টিকা আবিষ্কার করেন। তাঁর ব্যবহৃত পদ্ধতিতে ১৯২৬ সালে ডিপথেরিয়ার টিকা আবিস্কৃত হয়। পার্টুসিসের টিকা আসে ১৯৪৮ সালে। মরিস র‍্যাল্ফ হিলম্যান আবিষ্কার করেন হাম, মাম্পস, হেপাটাইটিস এ ও বি, জলবসন্ত, মেনিনজাইটিস, নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা। টিকার মাধ্যমেই ১৯৮৮ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ৯০% পোলিও দূর করতে সক্ষম হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।

টিকা আবিষ্কারের কারণে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যায় আরো ৩৫ বছর। সেইসব মানুষ, যারা আমাদের এত সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, তাদের চকবোর্ডের পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​