চলচ্চিত্রের একাল-সেকাল: অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী

“অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী”- স্বাধীনতার পর নির্মিত অন্যতম এক জনপ্রিয় মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র। এই ছবিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি খুব নিপুণ ও নিখুঁত চিত্রায়নের মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, আর সেই সাথে দেখানো হয়েছে যুদ্ধের মাধ্যমে ছিনিয়ে আনা সেই স্বাধীনতা, সেই বিজয় কতোটা প্রাপ্তির আর ঠিক কতোটা আনন্দের।

সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ১৯৭২ সালে নির্মিত হয় ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। পাকিস্তানি বাহিনীর কলুষিত হাতে আমাদের দেশের লাখো লাখো নারী যে কতোভাবে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয় সেই দিক গুলোই এত ফুটিয়ে তোলা হয়। বীরাঙ্গনা ও নির্যাতিত নারীদের স্বাধীন দেশে সুন্দর ভাবে ও সঠিক সম্মানে বেঁচে থাকার, তাদের পর্যাপ্ত অধিকার দেয়ার বিষয়টি এখানে রূপক আকারে দেখানো হয়েছে। মূলত বীরাঙ্গনাদের আকুতি, তাদের কষ্ট ও তাদের ত্যাগ এর প্রেক্ষাপট নিয়েই ছবিটির মূল কাহিনী। পাশাপাশি যুদ্ধে সাধারণ পরিবারগুলোর স্বপ্ন কিভাবে শেষ হয়ে যায় , কিভাবে তারা নিজের পরিবার, নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে- এ দিকগুলোও তুলে ধরা হয়েছে।

এই ছবিটতে যুদ্ধের সাথে জড়িত না, সেই মানুষগুলোকেও পাকিস্তানিরা কিভাবে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে সেটিও দেখানো হয়। তাছাড়া এদেশের দামাল ছেলেরা কিভাবে সে সময় নারীদের সম্মান ও নারীদের নির্যাতনের হাত থেকে বাচাতে ছুটে আসে সেই দিকটিও চিত্রায়িত হয়েছে। ছবিটিতে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়, তা হলো যারা যুদ্ধের ভয়ে দেশের বাহিরে অবস্থান নেয়, তাদের দেশের প্রতি ভালোবাসা, মমত্ব ও দেশে ফিরে আসার আকুতি। শুধু তাই নায়, স্বাধীন বাংলাদেশের এটিই প্রথম ছবি যেখানে পর্দায় প্রথম যুদ্ধশিশুদের অধিকার ও তাদের সামাজিক মর্যাদার ব্যাপারটি তুলে ধরা হয়েছে। লাঞ্ছিত নারীদের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা ও পুণর্বাসনের জন্য যে কাজ করতে হবে তা এই ছবি আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে।

ছবিটির প্রধান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেন ববিতা, উজ্জ্বল ও আনোয়ার হোসেন। তাদের অসম্ভব দক্ষ অভিনয়ের জন্য বেশ ব্যবসা-সফল ও প্রশংসিত হয়েছিল চলচ্চিত্রটি। এ ছবিতে ব্যবহার করা হয় জনপ্রিয় গান ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।’ অনেকের মতে, সাধারণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র গুলোর তুলনায়, এই ছবিটিতে পুরো ঘটনা ও গল্প অনেকটা ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন ভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেটি গৎবাঁধা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক যেকোনো সিনেমা থেকে বেশ আলাদা। পুরো মুক্তিযুদ্ধকেই যেন বাস্তবিক আকারে তুলে আনা হয়েছে এখানে। উপস্থাপনা, নির্মানশৈলী, অভিনয় সব কিছুতেই ছিল ভিন্নতা।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​