চলচ্চিত্রের একাল-সেকাল: চিত্রা নদীর পারে

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, হিংসা কিংবা ঘৃণা; কোনোটিই নতুন কিংবা বর্তমান সময়ের উদাহরণ নয়; এর শেকড় অনেক বেশি পুরনো। বঙ্গভঙ্গ, দ্বিজাতিতত্ত্ব, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ এই সব কিছুই সংখ্যালঘু মানুষের উপর ধর্ম কিংবা জাতিগত পার্থক্যের দোহাই দিয়ে নির্মম অত্যাচার, নিপীড়ন কিংবা বাড়াবাড়ির সেই পুরনো ইতিহাসের চাক্ষুস জানান দেয়। আর এসব সাম্প্রদায়িকতাকে ধুয়ে মুছে ফেলতেও তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র, “চিত্রা নদীর পারে” চলচ্চিত্রটি তার মধ্যে অন্যতম। তানভীর মোকাম্মেল এর এই ছবিটিতে ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিতে জাতিতে হিংসা; সেই সাথে সংখ্যালঘু মানুষের হাহাকার বেশ সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সাতচল্লিশ এর দেশ বিভাগ হয়েছিল হিন্দু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। চিত্রা নদীর পারের পাশের ছোট্টো গ্রামের মানুষের মধ্যেও তখন হিন্দু মুসলিমের বিভেদ দেখা দেয়, অনেক হিন্দু তখন এই দেশ ছেড়ে কলকাতা চলে যায় নিরাপদ আশ্র‍য়ের তাগিদে। এক হিন্দু পরিবার দেশপ্রেমের কারণে ছাড়তে পারে না নিজ দেশের মাটি। নিজ ভূমিতে, এই চিত্রা নদীর পারে অবস্থানের সিদ্ধান্ত থেকেই এই চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনীর সূত্রপাত ঘটেছে। এখানে যেমন বিভিন্ন ধরনের শব্দ ব্যবহার করে হিন্দু মুসলিম দের মধ্যে পার্থক্য দেখানো হয়েছে, লাল পিপড়া বা কালো পিপড়ার মাধ্যমে আমরা হিন্দু- মুসলিমের বিবেধ গড়ে তুলি সেটা তুলে ধরা হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিবেশী হিন্দু- মুসলমানদের একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি ও ভালোবাসা, বেশ কিছু অসাম্প্রদায়িকতার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।

এই চলচ্চিত্রটিতে এটিও দেখানো হয়, ছেলেবেলার বন্ধুত্ব হিন্দু-মুসলিম কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ মানে না। ছবিটিতে যে দিকটিতে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে তা হলো ১৯৬৪ সালের ভারতীয় রায়ট কিংবা দাঙ্গা। কাশ্মীরে সূত্রপাত ঘটা এই ধর্মীয় দাঙ্গার প্রভাব ভারত ছাপিয়ে এই ছোটো ভূখন্ডে কিভাবে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে আর কিভাবে এটি সংখ্যালঘুদের গ্রাস করতে থাকে তার ধারণা পাওয়া যায় এই চলচ্চিত্রটিতে। ছবিতে পড়াশুনা ও ছাত্রদের আন্দোলনের দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। কিভাবে আন্দোলন করতে যেয়ে হাজার তরুণ নির্যাতিত হয় ও প্রাণ হারায় সেই দিকটিও এখানে বিশ্লেষিত হয়েছে।

পুরো ছবিটি তৎকালীন সামাজিক অবস্থার একটি সম্পূর্ণ চিত্র। সেই সাথে, শুরু থেকেই যে নারীরা এ সমাজে নির্যাতিত ও অবহেলিত তার দিকটিও এখানে চিত্রায়িত হয়েছে। এর একটি বিশেষ দিক হলো, পুরো ছবিটিতে সে সময়ের সামাজিক চিত্রের প্রতিটি জিনিস খুব পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশপ্রেম, সাম্প্রদায়িকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, বন্ধুত্ব, সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন, নারীদের অবস্থান সব কিছুর সংমিশ্রনে এই চলচ্চিত্রটি যেন বাস্তব অবস্থার একটি হাতছানি।

চলচ্চিত্রটি ১৯৯৮ সালে মুক্তি পায়। ১৯৯৯ সালে সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতে নেয়। এছাড়াও সর্বমোট ৭ টি পুরস্কারে ভূষিত হয়। আফসানা মিমি, তৌকির এর মতো কিছু কালজয়ী অভিনেতা- অভিনেত্রী তাদের নিপুণ অভিনয়ের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক অসাম্প্রদায়িক সামাজিক নানা চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন ছবিটিতে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​