চলচ্চিত্রের একাল-সেকাল: তিতাস একটি নদীর নাম

সত্তরের দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত অসম্ভব জনপ্রিয় এক চলচ্চিত্র- ‘তিতাস একটি নদীর নাম।’ অদ্বৈত মল্ল বর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন পরিচালক ঋত্বিক ঘটক। সুন্দর গল্প আর নিপুণ চিত্রায়নের মাধ্যমে ছবিটি একাল কিংবা সেকাল যে কোনো সময়ের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যেই শীর্ষেই অবস্থান করবে নিঃসন্দেহে।

নদীমাতৃক এ বাংলাদেশের হাজারো নদীর একটি তিতাস। এ নদীর নামেই আর একে ঘিরেই এর গল্পটি রচিত হয়েছে৷ ছবিটিতে এদেশের নদী কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও নদীকে ঘিরে আমাদের সাধারণ মানুষের জীবন চলার গল্পই তুলে ধরা হয়েছে। গ্রাম বাংলায় নদীকে কেন্দ্র করে এক একটি এলাকা, এক একটি লোকালয় গড়ে উঠে। কেমন হয় সেই লোকালয়ের মানুষদের নদীর সাথে সখ্যতা! চলচ্চিত্রটিতে তিতাসের সাথে সেই নদীবিধৌত লোকালয়গুলোর মানুষের জীবন যাপনের সম্পর্ক, নদীর উপর তাদের নির্ভরশীলতা ও তাদের সামাজিক জীবনের নানা দিক, দুঃখ- কষ্ট, আনন্দ- বেদনা সব কিছুই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

ছবিটির শুরুতেই তিতাসের শুকিয়ে যাওয়া পাড় নিয়ে নানা ঘটনা চিত্রায়িত হয়। এতে মাছ ধরা জেলেদের দৈনন্দিন জীবন,মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের নানা গল্প এই ছবিটিতে প্রকাশ পায়। শুধু তাই নয়, তাদের অভাবের তাড়নায় নানা টানাপোড়েন, জালে বেশি মাছ ধরার আকুতি, অভাবের তাড়নায় বিপর্যস্ত পরিবারের নানা কাহিনি, নানা দুর্দশা এখানে চিত্রায়িত হয়েছে।

এছাড়াও সমাজে উচুপর্যায়ের মানুষগুলোর সাধারণ মানুষের উপর নানা শোষণ, নিপীড়ন ও অত্যাচার; শোষিত ও নিপীড়িত এই দরিদ্র মানুষগুলোর জীবনের নানা চড়াই উতরাই সব কিছুও যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছিল এই চলচ্চিত্রে। পুরো ছবিটি তৎকালীন নদীকেন্দ্রিক সামাজিক অবকাঠামো ও অবস্থার নানা চিত্র রূপক আকারে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।

প্রায় দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন গোলাম মুস্তাফা, কবরী চৌধুরী, রোজী সামাদ, প্রবীর মিত্র সহ আরো অনেক গুনী। শুধু তাই নয় পরিচালক ঋত্বিক ঘটক নিজেও এই ছবিটিতে অভিনয় করেন। ইনি ভারতীয় বাঙালি একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা। জানা যায়, ১৯৭৩ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে এদেশে আসেন এবং এর পরেই এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন।

সাদা-কালো এই ছবিটি ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই মুক্তি পায়। সত্তরের দশকের ছবি হলেও বর্তমানে এর গ্রহণযোগ্যতা যেন বিন্দুমাত্র কমেনি। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের সেরা ১০ টি সিনেমার দুটি তালিকার দুটিতেই প্রথম স্থান অধিকার করে এই “তিতাস একটি নদীর নাম”। তিতাস নদী আর তার আশেপাশের মানুষদের বিশেষ করে জেলেদের জীবন যাত্রার কাহিনী লিপিবদ্ধ হলেও প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সত্তর দশকের সামাজিক অবস্থার ও নদীনির্ভর মানুষের সরল জীবনের নানা দিক তুলে ধরাই ছিল এই চলচ্চিত্রটি তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​