কোয়ারেন্টিনে মানসিক স্বাস্থ্য

যদি কোনো দেশের জনগণ, প্রাদুর্ভাব বা মহামারী আকার ধারণ করার সম্ভাবনা আছে এমন কোনো অতি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হন, তবে জনগণের স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত ফেডারেল এবং রাষ্ট্রীয় আইন কার্যকর করার অধিকার সেই দেশের সরকারের রয়েছে। আর সেই আইনের আওতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের জন্যই প্রয়োজন হয় সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন সম্পর্কে সবার স্পষ্ট ধারণা অর্জন করা।


সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা রোগের সংক্রমণ সীমিত করার একটি উপায়, যেখানে দুজন মানুষের মধ্যে রোগের সংক্রমণ ঘটবে না এমন একটা নিরাপদ দূরত্ব থাকা। সেক্ষেত্রে জনসমাগম হয় এমন অনুষ্ঠান, সমাবেশ বন্ধ বা বাতিল করা হয়। কোয়ারেন্টিন, সংক্রামক রোগের সংস্পর্শে এসেছে এমন মানুষ অসুস্থ হয় কিনা তা দেখার জন্য তাদেরকে আলাদা করে রাখা ও তাদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ করার একটি উপায়। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী হয় যতক্ষণ না নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে সেই মানুষটি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয় নি। আর আইসোলেশন হলো যতদিন রোগটি সংক্রমিত হচ্ছে ততদিন সংক্রমণের শিকার অসুস্থ রোগীকে সুস্থদের থেকে আলাদা করে রাখার পদ্ধতি।

Image Courtesy: iStock

এই সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনে থাকাকালীন ও তার পরবর্তী সময়টা আমরা নানারকম অনুভূতি ও ভাবনার মধ্য দিয়ে পার করি। এই ভিন্ন অভিজ্ঞতার সময়টায় মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের জানতে হবে কি করা উচিত, কি উচিত নয়।

এই সময়টায় মানুষ যেসব বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ভয় অনুভব করতে পারে সেগুলো হলো –

• নিজের স্বাস্থ্য অবস্থা ও যাদের সংস্পর্শে এসেছেন তাদের স্বাস্থ্য অবস্থা।
• নিজের কারণে পরিবার ও বন্ধুমহলকে কোয়ারেন্টিনে যেতে হলে তাদের অসন্তোষের শিকার হওয়া।
• রোগের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কিনা তার জন্য নিজের ও অন্যের দ্বারা মনিটর হওয়ার অভিজ্ঞতা।
• কর্মক্ষেত্রে বিরতি, আয় ও কর্ম নিরাপত্তার সম্ভাব্য ক্ষতি।
• নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের (মুদি ও ব্যক্তিগত সেবা) সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ।
• নিজের তত্ত্বাবধানে থাকা শিশু ও অন্যদের কার্যকরভাবে যত্ন নেয়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়া।
• কতোদিন এভাবে চলতে হবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা ও হতাশা।
• পরিবার ও পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় একাকিত্ব বোধ।
• অন্যদের অবহেলার দরুন নিজে রোগের সংস্পর্শে চলে আসার চিন্তা থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি।
• কাজ করতে না পারা ও দৈনন্দিন কাজে যোগ দিতে না পারার কারণে বিরক্তি ও হতাশা।
• পরিস্থিতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব।
• পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অ্যালকোহল বা ড্রাগ ব্যবহার করার ইচ্ছা।
• হতাশার লক্ষণ প্রকাশ যেমন হতাশ অনুভূত হওয়া, ক্ষুধা পরিবর্তন হওয়া, খুব কম বা খুব বেশি ঘুমানো।
• পোস্ট ট্রোমেটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) এর লক্ষণ প্রকাশ, যেমন যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি, ফ্ল্যাশব্যাকস (ঘটনাকে পুনরায় সঞ্চারিত করা), দুঃস্বপ্ন, চিন্তাভাবনা এবং মেজাজে পরিবর্তন এবং সহজেই চমকে যাওয়া।

Image Courtesy: Medical Xpress

সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন এর সময় নিজেকে সমর্থন যোগানোর উপায়ঃ
বিপদের মাত্রা বোঝা:
• মিডিয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে রোগের মহামারী বা বিপদের মাত্রা বোঝার ক্ষেত্রে ত্রুটিযুক্ত হতে পারে। তাই মিডিয়া এক্সপোজারকে সীমাবদ্ধ রেখে কী হচ্ছে তা নিয়ে আপ টু ডেট থাকুন। ২৪/৭ খবর দেখা বা শোনা এড়িয়ে চলুন যেহেতু এটি উদ্বেগকে বাড়িয়ে তোলে।
• রোগের প্রাদুর্ভাবের তথ্য সম্পর্কে জানতে বিশ্বাসযোগ্য উৎসগুলো দেখুন।
তথ্যপ্রাপ্তির জন্য নির্ভরযোগ্য উৎস:

  • সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, (http://www.cdc.gov)
  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, (http://www.who.int/en)
  • জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর), নম্বর: ১০৬৫৫, ০১৯৪৪৩৩৩২২২
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর( http://dghs.gov.bd) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (mohfw.gov.bd) , স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ
  • সাম্প্রতিক করোনা বিষয়ক তথ্য পেতে ওয়েবসাইট corona.gov.bd

নিজে নিজের সমর্থক হন: কোয়ারেন্টিনে থাকলেও সুরক্ষিত, নিরাপদ এবং আরামদায়ক বোধ করার জন্য আপনার যা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করুন।
• প্রয়োজন অনুসারে কীভাবে মুদি ও টয়লেট্রিস আপনার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন তা জানতে স্থানীয়, রাষ্ট্র বা জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সাহায্য নিন।
• প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারীদের অবহিত করুন এবং আপনি যে ওষুধগুলি অব্যাহত রাখছেন তা নিশ্চিত করার জন্য তাদের সাহায্য নিন।

স্বশিক্ষিত হন:
• প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ভয় পাবেন না। স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারীর সাথে সুস্পষ্ট যোগাযোগ সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনের সাথে সম্পর্কিত যে কোনও দুর্দশা হ্রাস করতে পারে।
• সহজলভ্য থাকতেই প্রয়োজনীয় লিখিত তথ্য সরবরাহ করুন।
• নিজে অপারগ হলে পরিবার বা বন্ধুদের মধ্যে একজনকে বলুন তথ্যগুলো সংরক্ষণে রাখতে।

কর্মস্থলে যেতে অক্ষম ও আর্থিক অবস্থা নিয়ে উৎকণ্ঠা হ্রাসে চাকরিদাতার সাথে কথা বলুন:
• কাজ করতে না পারার কারণ স্পষ্ট ভাবে সবিস্তারে চাকরিদাতা বা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন।
• যেসব ক্ষেত্রে মাসিক বিল দিতে হয় তাদেরকে আপনার অবস্থার কথা জানান ও প্রয়োজনে বিল পরিশোধে বিকল্প পদ্ধতির জন্য অনুরোধ করুন।

অন্যদের সাথে যুক্ত থাকুন: সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের কারণে সৃষ্ট উৎকণ্ঠা, হতাশা, একাকিত্ব ও বিরক্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো যাদেরকে বিশ্বাস করেন তাদের সাথে যুক্ত থাকা।
• টেলিফোন, ইমেইল, ক্ষুদে বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধু, পরিবার ও অন্যদের সাথে যুক্ত থাকুন।
• স্কাইপে বা ফেইসটাইম এর ব্যবহার করে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে ‘ফেইস টু ফেইস’ কথা বলুন।
• স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকলে বন্ধু বা প্রিয়জনদের মাধ্যমে পত্রিকা, মুভি ও বই সরবরাহের ব্যবস্থা করুন।
• ইন্টারনেট, রেডিও ও টেলিভিশন ব্যবহার করুন যাতে স্থানীয়, জাতীয় এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইভেন্টের সাথে আপনি সামিল হতে পারেন।
• অ্যালকোহল বা মাদক সংক্রান্ত চলতি কোনো সমস্যা নিয়ে যদি আপনাকে কারো সাথে যুক্ত হতে হয় তবে স্থানীয় অ্যালকোহলিক বা নারকোটিক অ্যানোনিমাস অফিসে যোগাযোগ করুন।

ডাক্তারের সাথে কথা বলুন: আপনি যদি কোয়ারেন্টিনে থাকেন, এবং আপনার বা আপনার প্রিয়জনদের কোনো শারীরিক লক্ষণ নিয়ে আপনি উদ্বিগ্ন হন তবে আপনার ডাক্তার বা অন্য স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারীকে কল করুন।
• আপনার সরবরাহকারীকে জিজ্ঞাসা করুন যে মানসিক স্বাস্থ্য, সাবস্টেন্সের ব্যবহার বা শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে স্কাইপ বা ফেসটাইমের মাধ্যমে দূরবর্তী অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় নির্ধারণ করা সম্ভব কিনা।
• আপনার চিকিৎসককে না পেলে এবং আপনি উৎকণ্ঠা বোধ করছেন বা সঙ্কটে আছেন এমন পরিস্থিতিতে নিচের হটলাইন নম্বরগুলিতে কল করুন।

Image Courtesy: freepik

শিথিল হওয়া ও মানিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহারিক উপায়:
• গভীর শ্বাস নিন, হাত-পা প্রসারিত করুন, ধ্যান বা প্রার্থনা করুন অথবা আপনি উপভোগ করেন এমন কাজ করে আপনার শরীরকে বারবার শিথিল করুন।
• চাপযুক্ত কার্যাবলির মধ্যে নিজেকে গতিশীল করুন। একটি কঠিন কাজ করার পরে মজাদার কিছু করুন।
• সহায়ক মনে করে থাকলে আপনার অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি সম্পর্কে প্রিয়জন এবং বন্ধুদের সাথে কথা বলুন
• ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করুন। কৃতজ্ঞচিত্ততা প্রকাশে একটা জার্নাল বা ডায়েরি লিখতে পারেন।

সামাজিক দুরত্ব, কোয়ারান্টিন বা আইসোলেশনের পর: আপনি যেমন স্বস্তির অনুভূতি পেতে পারেন তেমনি মিশ্র আবেগও অনুভব করতে পারেন। আপনার অসুস্থতার কারণে আইসোলেশনে ছিলেন বলে, আপনি দু:খ বা ক্রোধ অনুভব করতে পারেন। কারণ বন্ধু এবং প্রিয়জনরা হয়তো আপনার সংস্পর্শ থেকে এই রোগটি সংক্রমণের বিষয়ে একটা ভিত্তিহীন ভয়ের মধ্যে আছে। এই সাধারণ ভয়টা কাটানোর সর্বোত্তম উপায় হলো এই রোগ ও অন্যের জন্য রোগটির সত্যিকার ঝুঁকি সম্পর্কে শেখা। এই তথ্যটি শেয়ার করে নেওয়াটাই ভয়কে শিথিল করে। যদি আপনি বা আপনার প্রিয়জন মারাত্মক মানসিক চাপের উপসর্গ যেমন- ঘুমের ব্যাঘাত, অতিরিক্ত বেশি বা অতিরিক্ত কম খাওয়া, দৈনন্দিন কাজ পরিচালনায় অক্ষমতা, মারাত্মক হতাশা অনুভব করেন, ড্রাগ বা অ্যালকোহল ব্যবহারের ইচ্ছা হয় তবে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারীর সাথে কথা বলুন, অথবা প্রদত্ত হটলাইনে কল করুন।

 চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে- 
 ★ জাতীয় কল সেন্টার ৩৩৩
 ★ স্বাস্থ্যবাতায়ন ১৬২৬৩  
 ★ আইইডিসিআর ১০৬৫৫ 
 ★ বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭
 ★ জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ 
 ★ জাতীয় জরুরি সেবা হটলাইন ৯৯৯
 ★ সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতিতে জরুরি মনঃসামাজিক সহায়তা সেল-
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ০১৮১১৪৫৮৫৪১, ০১৮১১৪৫৮৫৪২, রোববার থেকে  বৃহস্পতিবার সকল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​