পৃথিবীর সবচেয়ে খর্বাকার জাতি – পিগমি

কখনো ভেবে দেখেছেন আজ থেকে যদি কয়েক লাখ বছর আগে জন্মগ্রহণ করতেন, পৃথিবীটা কেমন হত? জীবনটা কেমন হত? পুরোপুরি হয়তো অনুভব করতে নাও পারেন, তবে এখনও পৃথিবীর দুর্গম অঞ্চলগুলোতে কিছু উপজাতি আছে যারা তথাকথিত সভ্যতার আলোয় আসতে পারেনি। “পিগমি” জাতি হলো এমনই এক জনগোষ্ঠী এবং তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ও আছে। তারা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা খর্বাকৃতি জাতি। একই সাথে আফ্রিকা অঞ্চলের আদিমতম জাতিগোষ্ঠীও তারাই। বন নিধন, শিকারের অভাব ও যুদ্ধবিগ্রহের কারণে আজ তারা বিলুপ্তির পথে।

“পিগমি” একটি গ্রিক শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ “কনুই পর্যন্ত”। মূলত ছোট বোঝাতে এই শব্দ বোঝানো হয়। পিগমিদের নামটা আসলে তাদের উচ্চতা নিয়ে ঠাট্টা করেই দেয়া হয়েছিলো। আর পিগমি বলতে নির্দিষ্ট একটি গোত্রকেও বোঝায় না। বরং বামনাকৃতির জঙ্গলবাসী আদিম জনগোষ্ঠীকেই বোঝানো হয়। আর এই বামন জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর নানা স্থানে। অনেকেই মনে করেন পিগমিরা কেবলই আফ্রিকান। কিন্তু আসলে তা নয়। অস্ট্রেলিয়া, কঙ্গো, মালয়েশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি ইত্যাদি জায়গাতেও পিগমিদের দেখা পাওয়া যায়। তবে তারা কিন্তু নিজেদের মাঝে এই শব্দ ব্যবহার করেনা, তারা নিজেদের “বা” নামে ডাকে যার অর্থ “মানুষ”। অস্ট্রেলিয়া, কঙ্গো, মালয়েশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, ক্যামেরুন, ফিলিপাইন ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ১ লাখ পিগমি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। খর্ব দেহাকৃতি এদের অন্য উপজাতি থেকে আলাদা করেছে। এদের গড় উচ্চতা ৪ ফুট ১১ইঞ্চি। ১১ বছরের পর এদের উচ্চতা আর বাড়েনা। গবেষকদের মতে, এই অঞ্চলে খাপ খাওয়ানোর জন্য এদের গড় উচ্চতা এমনটি হয়ে থাকতে পারে।

Image Courtesy: Eurek Alert

পিগমিদের মধ্যে নানা ধরনের ভাষার প্রচলন রয়েছে । যেমন বাকা অঞ্চলের মানুষ বাকা ভাষায় কথা বলে। আমাদের মত ইট-সিমেন্টের বাড়ি তাদের দেখা যায়না,পাতা দিয়ে বানানো বাড়িতে তারা আজীবন থেকে আসছে। বিয়ে খুব একটা প্রচলিত নয় সমাজে। আবার ব্যাপকভাবে বহুগামীও নয় তারা। মূলত যাযাবর জীবন কাটালেও এদের মধ্যে দলপ্রধান বিদ্যমান। এরা আশেপাশের অঞ্চলগুলোর সাথে মিলেমিশে থাকে। মধু সংগ্রহ করা,ফল আহরণ কিংবা মাংস বিক্রির মাধ্যমে এরা এদের জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান দিয়ে থাকে। পিগমি জনগোষ্ঠীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নাচ। বিনোদনের মাধ্যমই না,বরং যোগাযোগের ও ভাবের আদান-প্রদানের জন্য ও এই নাচের ব্যবহার তারা করে থাকে।

পিগমি জনগোষ্ঠী নানা ধরনের কু-সংস্কারে বিশ্বাস করে। এদের নিজেদের মধ্যে অনেক ওঝা থাকে যারা ধর্মীয় ব্যাপারে ভূমিকা রাখে, এরা মনে করে মনে-প্রাণে তাদের জীবনে কোন ভুল করে থাকলে দেবতারা অসন্তুষ্ট হয়। এই ধারণা তাদের শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। শিকারে রয়েছে এদের বিশাল পারদর্শীতা। এরা অনেক দূর থেকে শিকারের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে,পায়ের চিহ্ন দেখে শিকারের আকার নির্ধারণ করতে পারে যা সত্যিই অসাধারণ।

সভ্যতার যত উন্নতি হয়েছে এদের অস্তিত্ব তত বিপন্ন হয়েছে। যুদ্ধবিগ্রহের কারণে বারবার এই অঞ্চলের শান্তি বিনষ্ট হয়েছে। ১৯০০ সাল পর্যন্ত বেলজিয়াম এদের তাদের যাদুঘরে নিয়ে গিয়ে প্রদর্শন করত যা মানবজাতির জন্য লজ্জাজনক। বিভিন্ন সময়ে এদের যৌনদাসী করে রাখা, রোয়ান্ডার গণহত্যায় পিগমি জনগোষ্ঠীর ১/৩ অংশ হত্যা করা হলেও এরা কখনো আলোচনায় আসেনি। আমার কিংবা আপনার মানবাধিকার নিয়ে যতটুকু কথা বলা হয় তার একফোটা ও এদের নিয়ে বলা হয়না। ইতালি, জাপান কিংবা স্পেনের মত দেশের বড় বড় কর্পোরেশগুলো অবাধে গাছ কেটে বন উজার করে দিলেও কারও কোন মাথাব্যথা নেই। দিনের পর দিন তাদের উপর এই অবিচার চলেছে। কিন্তু আজ তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে,বন উজার করে দেওয়ায় এরা খাদ্য সংকটে। অনেক গবেষকদের মতে মানব সভ্যতার প্রথম ধাপের মানুষ এরা, তাই এরা সন্দেহাতীতভাবে আমাদের গর্ব, এদের অস্তিত্ব যাতে বিপন্ন আর না হয় এই দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে তবে আমরা এই খর্বাকৃতি জাতি রক্ষা করতে পারব।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

বাবি ইয়ার এর গণহত্যা: নাৎসি বাহিনীর নৃশংসতার এক ভয়াবহ চিত্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত খুনোখুনির মধ্যেও ইউক্রেনের বাবি ইয়ার গণহত্যা একটি অন্যতম ঘটনা। ১৯৪১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, নাৎসি বাহিনী অধিকৃত

Read More

মহাবীর উইলিয়ামের ইংল্যান্ড অভিযানের আদ্যোপান্ত

মধ্যুযুগে ইংল্যান্ডের শাসনামল নিয়ে আলোচনা করার শুরুতেই ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ রাজত্বের কথা অবধারিতভাবে চলে আসে। ৫ম থেকে ১১শ শতাব্দী পর্যন্ত শাসন করে আসা এই

Read More

গুগল: প্রযুক্তি দুনিয়ার অনন্য এক মহারথী

বর্তমানে আমরা যেকোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে সর্বপ্রথম বই না খুলে সার্চ ইঞ্জিন এ খুঁজি। আর এক্ষেত্রে বেশিরভাগেরই প্রথম পছন্দ Google নামের সার্চ

Read More

ভাস্কো দ্য বালবোয়া: প্রশান্ত মহাসাগরের সন্ধান পাওয়া প্রথম ইউরোপিয়

একদম ছোটবেলা থেকেই আমরা পড়ে এসেছি পৃথিবীর ৩ ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। আর এর মাঝে সবচেয়ে বড় মহাসাগর হচ্ছে প্রশান্ত

Read More

হোন্ডা মটর কোম্পানি: অটোমোবাইল দুনিয়ার প্রতাপশালী রাজা

আজকের পৃথিবীতে বিভিন্ন কোম্পানি তৈরি করছে নানা ধরণের পণ্য। কিন্তু খুব কম প্রতিষ্ঠানই তাদের উৎপাদিত পণ্যের সাফল্যের কারণ হিসেবে নিজেদের নামকে প্রতিষ্ঠিত

Read More

ব্যাটল অফ হিল ২৮২: কোরিয়া যুদ্ধে ব্রিটেনের শোচনীয় পরাজয়ের কথন

কোরীয় যুদ্ধকে বলা হয়ে থাকে স্নায়ুযু্দ্ধের ইতিহাসে প্রথম ও সবচাইতে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। পঞ্চাশের দশকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ কেবল কোরিয়ার বেসামরিক

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​