শুভ জন্মদিন ফুটবল জাদুকর!

পৃথিবীতে প্রতিদিন অনেক কিছু ঘটে, অনেক খুচরো ঘটনাই চোখের পলকে ইতিহাস হয়ে যায় রোজ। একজন ইতিহাস বানিয়ে বসেন মাত্রই তো আরেকজন তা ভাঙতে বসে পড়েন! কিন্তু এসবের বাইরেও আরেকজন আছেন, যিনি স্বমহিমায় ইতিহাসের এই ভাঙা-গড়ার কাজকে একাই সামলাচ্ছেন একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই। ১২০ গজের ক্যানভাসে তুলি ছাড়াই পা দিয়ে জাদু ছড়িয়ে এবং চোখজুড়ানো ফুটবলসত্ত্বা দিয়ে ইতিহাস কিংবা রেকর্ড বানানোকে প্রতিদিনকার ছেলেখেলা বানিয়ে ছেড়েছেন তিনি। ফুটবলবোদ্ধা থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবণিতার অনেকেই কখনো কখনো তাঁকে ঈশ্বরের সমতুল্য কিংবা ভিনগ্রহের কেউ দাবি করে বসেন। তবে নিজেকে সাধারণের কাতারে বসিয়ে এই মানুষটা ফুটবলকে বানিয়েছেন এক অকল্পনীয় শিল্প, অক্লান্তভাবে সর্বকালের সেরা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি “The Greatest Of All Time”, ‘লিওনেল মেসি’। যার খেলা কয়েক মিলিয়নেরও বেশি মানুষের বিনোদনের স্থল, অনেকের ব্যক্তি আবেগের খোরাক কিংবা অনুভূতির চর্চাকেন্দ্র। হয়তো তার খেলা দেখে কেবল আমরা পৃথিবীবাসীরাই না, কল্পলোকের ভিনগ্রহবাসীরাও কুর্ণিশ জানিয়ে বসে তাঁকে। আজকের এই দিনেই আগমন ঘটেছিলো ফুটবল বিশ্বের মহারাজাধিরাজের, পৃথিবী বার্তা পেয়েছিলো এক বিষ্ময়কর জাদুকরের আগমনের!

মেসির জন্ম মধ্য আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে, হোর্হে হোরাসিও মেসি এবং সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনোর পরিবারে। রোজারিওতেই শৈশব কাটানো মেসি প্রথমদিকে স্থানীয় ‘নিউওয়েল্স ওল্ড বয়েজ’ ক্লাবে খেলা শুরু করেন। ফুটবলকে ধ্যানজ্ঞান বানানো মেসি স্বভাবসুলভ খেলায় অল্পদিনেই সকলের নজর কাড়েন। কিন্তু তাঁর খেলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় বিরল ‘গ্রোথ হরমোন’ রোগ। প্রতিমাসে ১হাজার ডলার ওষুধ সহ পুরোচিকিৎসার খরচ সামাল দেয়া মুশকিল হয়ে পড়েছিলো তাঁর পরিবারের জন্য। সেই দুঃসময়ে মেসির জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসেন স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার স্পোর্ট্স ডিরেক্টর চার্লস রেক্সাস। বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষের সাথে অনেক তর্ক-বিতর্কের পর তিনি তাদের মেসির চিকিৎসা এবং ফুটবল ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেবার জন্য রাজি করান এবং ২০০১ সালের শুরুতেই বার্সেলোনা যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’তে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকে কয়েক ধাপে বার্সেলোনার বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে খেলার পর তিন বছরের মাথায় মূল দলে সুযোগ করে নেন মেসি। ২০০৪ সালে আরেক স্প্যানিশ ক্লাব এসপানিওলের বিপক্ষে লা-লিগায় অভিষেক হয় মেসির।

Image Courtesy: ABC

২০০৫ সালে তাঁর অভিষেক হয় আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে। মেসির কাব্যিক ফুটবল মহাযাত্রার সূচনালগ্ন থেকেই ইতিহাসের পাতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। গোলপোস্টকে পাখির চোখ বানিয়ে অর্জুনের অব্যর্থ তীরের মতোন গোল করেছেন অভিষেকের পর থেকেই, একের পর এক রেকর্ড করে বার্সেলোনার অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছেন সময়ের সাথে। তাঁকে থামানোর উপায় বের করতে গিয়ে সকলকেই হতাশ হতে হয়েছে, অন্তত পরিসংখ্যান তাই বলে। রেকর্ডসংখ্যক ৬বার ‘ব্যালন ডি অর’ জিতেছেন তিনি। বার্সেলোনায় খেলছেন একটানা ১৬ বছর ধরে, যাদের হয়ে তিনি জিতেছেন মোট ৩২টি শিরোপা, যার মধ্যে রয়েছে ৯টি লা লিগা, ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এবং ৬টি কোপা দেল রে। লা লিগায় সর্বোচ্চ সংখ্যক গোল (৪০৮টি), লা লিগায় এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল (৫০টি), ইউরোপে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল (৭৩টি) এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ হ্যাট্রিকের (৮টি) রেকর্ডের মালিক তিনি। জাতীয় দল এবং ক্লাবের হয়ে তিনি ৭০০ গোল করার অনবদ্য রেকর্ড তাঁর ঝুলিতে, সাথে অন্যান্য খেলোয়ারদের গোল করানোর পেছনেও তাঁর অবদান আমাদের সকলেরই জানা। লা লিগা (১৬৩টি) এবং কোপা আমেরিকার (১১টি) ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলে সহায়তাকারীর রেকর্ডেরও মালিক তিনি। ডি-বক্সের বাইরে থেকেও গোল করতেও অনবদ্য তিনি, রয়েছে ৪২টি ফ্রি কিক থেকে গোল করার রেকর্ড।

ফুটবলার মেসির জীবনটা যতোটা জাঁকজমকপূর্ণ, তাঁর ব্যক্তি জীবনটা ততোটা অনাড়ম্বরময়। স্ত্রী অ্যান্তোনেল্লা রোকুজ্জো এবং তিন সন্তানকে নিয়েই ব্যক্তি মেসির ফুটবলের বাইরের জগৎ। প্রচুর চ্যারিটি করে থাকেন বলেও সুখ্যাতি রয়েছে তাঁর। ফুটবলে তাঁর সমকক্ষ কারো কথা ভাবলেই স্বাভাবিকভাবে চলে অাসে সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালাদোর নাম। তাঁদের ফুটবল দ্বৈরথ যতোটা না বেশি উত্তেজনার, তার চাইতেও বেশি আকর্ষণীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে। যদিও দুজনেই বেশ ভালো বন্ধু, তবুও খেলার মাঠে তাঁদের দ্বৈরথ কখনো কখনো ট্রয়যুদ্ধের হেক্টর বনাম একিলিসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এই দ্বৈরথের ফলাফলের পরিসংখ্যান বেশিরভাগ সময়েই মেসির পক্ষেই কথা বলে, যদিও পুরো ব্যাপারটুকু দুজনেই বেশ উপভোগ করেন বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে।

শেষটা করবো বার্সেলোনার সাবেক কোচ পেপ গার্দিয়োলার একটি উক্তি দিয়ে। মেসিকে নিয়ে লিখতে কিংবা কিছু বলতে বলা হলে আমাদের মতোন মেসিভক্তদের কিংবা ফুটবলে শিল্প খুঁজতে চাওয়া যুবাদের শব্দ হারিয়ে ফেলার বিষয়টি হয়তো তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। এই খেই হারানো ভালোবাসাটুকু এতোই নিখাদ যে ভিঞ্চির মোনালিসার হাসিটুকু পর্যন্ত মেসির বাম পায়ের কাছে নস্যি ঠেকে আবেগপ্লুত মনের ভারটুকু কমাতে তাই গার্দিয়োলার উক্তিকেই ভরসা মনে হয়, তিনি বলেছিলেন, “মেসির সম্পর্কে কিছু লিখো না, তাঁকে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টাও করো না। শুধু দেখে যাও তাঁকে”। সেই দেখার আরামের রেশ লেগে থাকুক এই পৃথিবীর সকল ফুটবলপ্রেমীর চোখে, অনাবিল আনন্দের উৎস হয়ে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

অ্যাপোলো ৭: মহাকাশ অভিযানে নাসার বিপ্লব

মানুষ চিরকালই কৌতূহলী। অজানাকে জানবার নেশা, অজেয়কে জয় করার প্রবল তৃষা মানবজাতিকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এই অদম্য স্পৃহার ফলেই পৃথিবীর

Read More

তুরের যুদ্ধ: ইউরোপে মুসলিমদের প্রথম পরাজয়

একটি নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব বিস্তারের লড়াই এবং একই সাথে আরেক জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই – এমন হাজারো সংগ্রামের ঘটনা দিয়েই

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​