যৌন হয়রানি: কী এবং কীভাবে

যৌন হয়রানি বরাবরই আমাদের সমাজের বড় ধরণের সমস্যাগুলোর একটি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা এর শিকার হলেও পুরুষ কিংবা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও এই ঘটনার ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন ব্যাপক হারে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় প্রায় নব্বই শতাংশেরও বেশি নারী বিভিন্ন সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন কাছের অথবা দূরের মানুষের মাধ্যমে। লিঙ্গভেদে হয়রানির ধরণ কিছুটা ভিন্ন হয়। তবে হয়রানির শিকার প্রতিটি মানুষই ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে কাটান সারাজীবন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহণ, পাবলিক প্লেস, কর্মস্থল সবখানেই ঘটে এই হয়রানির ঘটনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ হয়রানিমূলক কাজগুলোকে হালকা দুষ্টুমি, মজা করা হিসেবে দেখা হয় বলে গুরুত্ব হারায় বিষয়টি। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া কিছু যৌন হয়রানির চিত্রই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে।  

ইভটিজিং 

যৌন হয়রানির একদম প্রথম ধাপ হচ্ছে এই ইভটিজিং। বিভিন্ন সমীক্ষা ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যৌন হয়রানিমূলক ঘটনাগুলোর মধ্যে ইভটিজিংই সবচেয়ে বেশি হয়। অপরিচিত কিংবা পরিচিত যে কারো উদ্দেশ্যে অযাচিতভাবে শিস বাজানো, বিভিন্ন বিশেষণ ব্যবহার করে ডাকাডাকি করা কিংবা পথরোধ করে দাঁড়িয়ে প্রেমের প্রস্তাব দেয়া- বিভিন্ন নাটক বা সিনেমায় এই বিষয়গুলোকে স্রেফ মজার বা বীরত্বের কাজ হিসেবে দেখানো হলেও এগুলো সবই ইভটিজিং এর কাতারে পড়ে। একই সাথে এগুলো যৌন হয়রানিমূলক অপরাধও বটে। 


কারো লিঙ্গগত পরিচয়ের জন্য তাকে নিয়ে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করা

এই ঘটনা বেশি ঘটে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সাথেই। রাস্তাঘাটে আমরা প্রায়ই দেখি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে উদ্দেশ্য করে বাজে মন্তব্য করা হয়। আবার হয়ত কোনো নারী সাইকেল, মটরসাইকেল বা গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন, তখনও তীর্যক মন্তব্য ছুড়ে দেয়া হয় তার দিকে। এই কাজটিও যৌন হয়রানির অন্তর্গত। 


অনুমতি ছাড়াই ইচ্ছা করে কারো শরীর স্পর্শ করা, জড়িয়ে ধরা কিংবা অযথা শরীর ঘেঁষে থাকা

আপনি হয়তো ভীড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন বাসে বা ট্রেনে অথবা কোনো বহুতল ভবনের লিফটে, হঠাৎই আপনার শরীর স্পর্শ করে গেলো অচেনা কোনো ব্যক্তির হাত, কিংবা পাশের ব্যক্তিটি হয়তো ইচ্ছা করে আপনার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন- এমন অভিজ্ঞতা আছে অনেকেরই। আবার হতে পারে আপনার সহপাঠী বা সহকর্মী কেউ হুটহাট হাত রাখছে আপনার কাঁধে বা স্পর্শ করছে শরীরের কোথাও, নিষেধ করা সত্ত্বেও মানছে না আপনার কথা- এধরণের কাজগুলোও যৌন হয়রানিমূলক।


জোর করে কাউকে স্পর্শ কিংবা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা, যৌন নির্যাতন করা, ধর্ষণ করা

যেকোনো পরিস্থিতিতেই কেউ যদি কাউকে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে জোর করে, তবে তা অবশ্যই গুরুতর যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য। এবং অবশ্যই এই বিষয়টি লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।  


অযাচিতভাবে কাউকে পোশাক বা পোশাকের কোনো অংশ খুলতে বলা কিংবা খুলতে বাধ্য করা 

কোনো নারীকে অযথাই তার হিজাব বা বোরকা খুলতে বলা কিংবা জোর করে খোলানোও আরেকটি গুরুতর যৌন হয়রানিমূলক আচরণ।


পোশাকের জন্য কাউকে বিদ্রুপ করা

কারো পোশাক দেখে তার উদ্দেশ্যে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা আচরণ করাও কিন্তু যৌন হয়রানির মাঝেই পড়ে।


ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কুরুচিপূর্ণ টেক্সট মেসেজ, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি পাঠানো

পরিচিত হোক বা অপরিচিত, কিংবা বন্ধুস্থানীয় কাউকেও অযাচিতভাবে অশ্লীল জোকস, মেসেজ, ছবি ইত্যাদি পাঠানোও তাকে যৌন হয়রানি করার শামিল। বন্ধু হলেই কাউকে এমন কিছু পাঠানো যাবে না যাতে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন। 


অশালীন কথাবার্তা বা কৌতুক বলে কাউকে উত্যক্ত করা বা অস্বস্তিতে ফেলা 

অফিসের কলিগদের আড্ডায় কিংবা যেকোনো পার্টিতে, এমনকি বন্ধুদের আড্ডায়ও কাউকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য বা উত্যক্ত করার উদ্দেশ্যে অশ্লীল কথাবার্তা বা জোকস বলাটাও হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। বিরত থাকতে হবে এমন আচরণ থেকেও। আড্ডা বা পার্টিতে উপস্থিত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য- এমন আচরণই করা উচিত।


কারো শরীর বা শরীরের কোনো অঙ্গ নিয়ে বাজে মন্তব্য করা 

লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কাউকে তার শারীরিক বিষয়ে অশ্লীল কথাবার্তা বলা বেশ বড় ধরণের যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। এধরণের কাজ থেকেও বিরত থাকা উচিত।


চাকরিতে প্রোমোশন, পরীক্ষায় ভালো নাম্বার, উপহার, চাকরিচ্যুতি বা যেকোনো শাস্তির হুমকি- ইত্যাদির বিনিময়ে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দেয়া

এই কাজটিও অত্যন্ত গর্হিত যৌন হয়রানিমূলক অপরাধ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুসারে এসবের জন্য শাস্তিরও বিধান রয়েছে। 


কোনো কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে অযাচিতভাবে কারো কাছে যৌন সাহচর্যের দাবি করা

সহকর্মীর কোনো কাজ করে দিয়েছেন, কিংবা সহপাঠীর এসাইনমেন্ট; কাজ ছোট হোক কিংবা বড়, এর বিনিময়ে তার কাছে কোনো রকম যৌন সম্পর্কের আবদার করাও বড় ধরণের যৌন হয়রানিমূলক আচরণ। কোনো অবস্থাতেই এমনটা করা যুক্তিযুক্ত নয়।


এগুলোর বাইরেও আরো অনেক কাজ রয়েছে যেগুলো যৌন হয়রানিমূলক অপরাধের কাতারে পড়ে। আমাদের এই অপরাধগুলো সম্পর্কে জানতে হবে, নিজেকে সচেতন হতে হবে। কখনো হয়রানির শিকার হলে চুপ করে না থেকে প্রতিবাদ করতে হবে। আইন করে এসব অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসব অপরাধীরা পরিবার ও সমাজের সমর্থনে পার পেয়ে যায়। আবার পরিবারের শিশুরা বড়দের এধরণের আচরণ দেখেও শেখে। তাই শুদ্ধ আচরণের শিক্ষাটা পরিবার থেকেই দেয়া শুরু করতে হবে এবং সমাজের সর্বস্তরে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। আসুন, আজ থেকেই শুরু করি পরিবর্তনের পথে চলা। আর যেন কাউকে শিকার হতে না হয় যৌন হয়রানির। আমাদের সমাজ যেন হয় সুস্থ এবং সুন্দর, এমনটাই প্রত্যাশা। 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​