ক্লোন ভেড়া ডলি: চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষ্ময়কর এক আবিষ্কার

১৯৯৬ সালে ৫ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে পৃথিবীর সর্বপ্রথম ক্লোনড স্তন্যপায়ী প্রাণীটির জন্ম হয়। “ডলি” নামের সেই প্রাণী ছিলো একটি স্ত্রী ভেড়া। এর ক্লোন করা হয়েছিল একটি প্রাপ্তবয়স্ক ভেড়ীর স্তনের কোষ থেকে। স্কটল্যান্ডের রোজলিন ইনস্টিটিউটে এই ভেড়াটির জন্ম। মূলত এর কোড নাম “6LL3″। গায়ক এবং অভিনেত্রী ডলি পারটনের নাম অনুসারে এই ক্লোনড ভেড়াটির নামকরণ করা হয়। নামটি রেখেছিলেন একজন স্টকম্যান, যিনি ডলির জন্মের ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিলেন।

৬ বছরের ভেড়ীর স্তন থেকে কোষ সংগ্রহ করে ১৯৭০ এর দশকে মানব উর্বরতার চিকিৎসায় প্রথম ব্যবহৃত পদ্ধতিতে মাইক্রোস্কোপিক সূঁচ ব্যবহার করে সেই কোষগুলকে ল্যাবে কালচার করা হয়েছিল। বেশ কয়েকটি সাধারণ ডিম উৎপাদন করার পরে বিজ্ঞানীরা সারোগেট মা ভেড়ীর গর্ভে ডিম স্থাপন করেছিলেন এবং ১৪৮ দিন পরে একটি ডিম থেকে ডলির জন্ম হয়। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বেশ বিতর্কের সাথেই ডলির জন্ম প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়।

ঘোষণার পরপরই এর পক্ষে- বিপক্ষে যুক্তি দেয়া শুরু হয়। একদিকে সমর্থকরা যুক্তি দিচ্ছিলো যে, ক্লোনিং প্রযুক্তি চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটাতে পারে, জেনেটিক্যালি সংশোধিত প্রাণীর উৎপাদন মানুষের অর্গান ডোনার হিসাবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি “থেরাপিউটিক” ক্লোনিং বা স্টেম সেল সংগ্রহের দ্বারা ভ্রূণের ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে অ্যালঝাইমারস এবং পার্কিনসনের মতো ডিজেনারেটিক স্নায়ুজনিত রোগের চিকিৎসার বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে। কিছু বিজ্ঞানী বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণের সম্ভাব্য উপায় হিসাবে প্রাণী ক্লোনিংয়ের আশা করেছিলেন। অন্যদিকে, ক্লোনিং বিরোধীরা নতুন ক্লোনিং প্রযুক্তিটিকে সম্ভাব্যরূপে বিপজ্জনক এবং অনৈতিক হিসাবে দেখেন, বিশেষত যখন তারা বুঝতে পারেন এর পরবর্তী ধাপ Human Cloning বা মানুষের ক্লোনিং হতে পারে।

এক বছর বয়সে ডলির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছিল যে তার টেলোমেয়ারগুলি একটি সাধারণ ভেড়ার তুলনায় ছোট। মনে করা হয় যে, ডলির সংক্ষিপ্ত টেলোমেয়ার এর কারণ তার ডিএনএ একটি প্রাপ্ত বয়স্ক ভেড়া থেকে এসেছিল এবং তার বিকাশের সময় টেলোমেয়ারগুলি পুরোপুরি গঠিত হয়নি। যার ফলে ডলি তার প্রকৃত বয়সের চেয়ে ‘বয়স্ক’। এছাড়া তার স্বাস্থ্যে কোনোরকম ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায়নি যা তার অকাল বা দ্রুত ত্বকের বৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে। ডলি তার জীবনের পুরোটা সময়ই কাটিয়েছিলো দ্য রোজলিন ইনস্টিটিউটে। মাঝে মধ্যে মিডিয়ার সামনে উপস্থিত হওয়া বাদে ইনস্টিটিউটের অন্যান্য ভেড়ার মতই সাধারণ জীবনযাপন করছিলো সে।

কয়েক বছর পর ডলি ডেভিড নামের একটি ওয়েলশ মাউন্টেন প্রজাতির পুরুষ ভেড়ার মাধ্যমে মোট ছয়টি মেষশাবকের জন্ম দিয়েছিল। তাদের প্রথম মেষশাবক, বনি ১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে জন্মগ্রহণ করে। পরের বছর যমজ সেলি এবং রোজি জন্ম নেয় এবং এর পরের বছর লুসি, ডারসি এবং কটন একসাথেই জন্মেছিল। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে সনাক্ত করা হয় যে, ডলি জাগ্যাসিকেট শিপ রেট্রোভাইরাস (JSRV) নামে একটি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত, যা ভেড়ার ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। ২০০১ সালে ডলির বাতজনিত রোগ ধরা পড়ে। অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ঔষধের মাধ্যমে সাফল্যের সাথে রোগটির চিকিৎসা করা হয়েছিল, যদিও বাতের কারণটি কখনও আবিষ্কার করা যায়নি।

২০০৩ সালে যখন ডলির কাশি হয় তখন একটি সিটি স্ক্যান পরীক্ষা দ্বারা ডলির ফুসফুসে টিউমার দেখা যায়। তাকে ভুগতে না দিয়ে টিউমারটির নিরাময় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই রোগ নির্ণয়ের ফলে ক্লোনিং প্রক্রিয়াতে জিনগত অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে প্রশ্নের মুখোমুখি হয় বিজ্ঞানীরা। মাত্র ছয় বছর বয়সে ২০০৩ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারি ক্লোন ভেড়া ডলি মৃত্যু বরণ করে। তার মৃত্যুর পরে রোজলিন ইনস্টিটিউট ডলির দেহটি এডিনবার্গের National Museum of Scotland এ দান করেছিলেন, যেখানে ডলি জাদুঘরের অন্যতম জনপ্রিয় প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছিল।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​