ডেট্রয়েট রায়ট: বর্ণবৈষম্যের শেকলে কুঠারাঘাত

বর্ণবৈষম্য পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধগুলোর মধ্যে অন্যতম। শুধু একটি নির্দিষ্ট দেহের রঙ নিয়ে জন্মগ্রহণ করার কারণে তাদের ঘৃণার চোখে দেখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং করা কিংবা সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করার এই রীতির প্রচলন সুপ্রাচীনকাল থেকেই। তবে এই তথাকথিত কালো সসম্প্রদায়ের মানুষ যে আজীবন মুখ বুজে সহ্য করে গেছে তা নয়, বরং অনেক সময়ই তাদের প্রতিবাদ দাঙ্গার পর্যায়ে উপনিত হয়েছে। ১৯৬৭ সালে আমেরিকার মিশিগান শহরের এমনই এক দাঙ্গা যা “Detroit Riot” নামে পরিচিত, ইতিহাসের বড় দাঙ্গাগুলোর মধ্যে অন্যতম।


এই দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিল ২৩ জুলাই। মিশিগান পুলিশ শহরের পুলিশ ভার্জিনিয়া পার্কের ১২তম সড়কের তথাকথিত একটি লাইসেন্স বিহীন বারে অভিযান চালিয়ে ৮২ জন আফ্রো-আমেরিকান মানুষকে গ্রেফতার করে। মূহুর্তের মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে আশেপাশের মানুষজন রাস্তায় নেমে পড়ে। প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহর জুড়ে। আবাসিক ভবন থেকে শুরু করে সরকারী প্রতিষ্ঠান ভাংচুর, লুটপাট করে তারা। সময় বাড়ার সাথে সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই মূহুর্তে সবার মনে হতে পারে খুব তাড়াতাড়ি এত বড় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরলো কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আরো পিছনে ফিরে তাকাতে হবে।


আমেরিকায় বসবাসকারী কৃষ্ণাঙ্গরা বরাবরই শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়ে এসেছে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য শুধু নয়, কর্মস্থলে বৈষম্যও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। একই দেশে জন্মগ্রহণ করার পরও বর্ণের ভিত্তিতে পৃথক বিদ্যালয়ে পড়া, বাজেটের বৈষম্য দেখে একটি শিশু বড় হয়েছে। শুধু তাই নয়, পুলিশের নিপীড়ন ও একই ভুল করে গুরুতর শাস্তি যেন এই মানুষগুলোর ভাগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সর্বশেষ যে বিষয়টি তাদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আক্রোশ সৃষ্টি করে তা হল, একে একে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া, যার ফলে তীব্র বেকারত্ব দেখা দেয়। আর এ কারণে তাদের জমে থাকা ক্ষোভ বিক্ষোভে পরিণত হয়, আর এই ঘটনা একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে মাত্র।


এই দাঙ্গা ৫দিন স্থায়ী হয়েছিল। এতে ৪৩ জন মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ৩৩ জন ছিলো কৃষ্ণাঙ্গ, বাকী ১০ জন ছিলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। সেসময় ৭ হাজার মানুষ গ্রেফতার হন, ১ হাজার বাড়িঘর ও স্থাপনা ধ্বংস হয়। ৭০০ পরিবার আত্মগোপনে চলে যায়। আমেরিকা তো বটেই, পুরো বিশ্বই এ ঘটনায় চমকে গিয়েছিলো । তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি.জনসন একটি কমিটি গঠন করেন, যা পরবর্তী সময়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে এবং সেখানে এই ঘটনার জন্য দারিদ্র্যতা, বর্ণবাদ ও পৃথকীকরণকে দায়ী করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হলেও এখনো এই বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি, যা আমরা দেখতে পাই সাম্প্রতিক সময়ে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনার মাধ্যমেও।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​