মাচু পিচু: ইনকা সভ্যতার হারানো নিদর্শন

পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন স্থাপত্য, শহর আমাদের বিস্ময়ের জায়গা জুড়ে রয়েছে বহুকাল আগ থেকেই। বিভিন্ন সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে এসব বিস্ময়কর স্থাপত্য কিংবা শহর শুধু মাত্র দর্শন হিসেবেই না, ইতিহাসের পাঠ হিসেবেও সচেতন মানুষদের কাছে সবসময় অন্যরকম গুরুত্ব পেয়ে আসছে। সেসব বিস্ময়ের মধ্যে রয়েছে মাচু পিচু যা বিশ্বের নতুন সপ্তমাশ্চর্যেের একটি। ইনকা সভ্যতার গড়া এই নিদর্শন ঐতিহাসিকভাবে ভীষণ আলোচিত এবং অনেক অধরা রহস্যের জালে আবৃত। মাচু পিচু শহরের অবস্থান পেরুতে, যা ইনকা সভ্যতার হারানো নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। এই শহর ‘সূর্যনগরী’ হিসেবে বিখ্যাত কারণ শহরে আবিষ্কৃত সূর্যমন্দির নির্দেশ করে যে অধিবাসীদের বেশিরভাগই ছিলেন সূর্যের উপাসক।


আন্দিজ পর্বতমালা পেরুর অংশের দিকে একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মাচু পিচু। শহরটির সুপরিকল্পিত নির্মাণ এবং এর সুরক্ষিত অবস্থান দেখে অনেকে মনে করেন, এটি ইনকাদের রাজকীয় দূর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে অনেকেই অবশ্য দ্বিমত পোষণ করেন যাদের মতে রাজা এটি অবকাশ যাপনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন।মাচু পিচু শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৪০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এত উঁচুতে কীভাবে এই শহরটির নির্মাণ হয়েছিল তা একটি বড় রহস্য। কারণ শহরটি বানানোর জন্য ব্যবহৃত পাথর বহনের মতো চাকার ব্যবহার ইনকাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল না। ধারণা করা হয় শত শত শ্রমিক পাহাড়ের ঢালু জায়গা দিয়ে ঠেলে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিল এই সব পাথর। শহরটিতে ১৪০ টি স্থাপনার মধ্যে এখনো সবকটিই টিকে আছে।


ধারণা করা হয়,মাচু পিচু প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৪৫০-১৪৬০ এর মাঝামাঝি সময়ে। এর নির্মাণকাল অতিবাহিত হয়েছিলো দুইজন বিখ্যাত ইনকা শাসকের শাসনামলে, পাচাকুটেক ইনকা ইউপানকি এবং টুপাক ইনকা ইউপানকি। তবে তা খুব বেশি দিন ভোগ করতে পারেনি ইনকারা। স্মল পক্সের প্রাদুর্ভাবে মাত্র অাশি বছর পরেই এই শহরের বেশিরভাগ অধিবাসীরা শহর ত্যাগ করে। অার শহরের প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পরেই স্প্যানিশদের আক্রমণে ইনকা সভ্যতাই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু মাচু পিচু শহরটি স্প্যানিশদের সন্ধানের বাইরে থাকায় এটি বেঁচে যায়, তবে হয়ে পড়ে পরিত্যক্ত ও জনমানবহীন। প্রায় চারশ বছর পৃথিবীর সাথে সংযোগহীন অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও এই শহর স্থানীয়দের কাছে নিজের স্বমহিমায় পরিচিত ছিলো।


১৯১১ সালের ২৪ জুলাই আমেরিকার অভিযাত্রী হিরাম বিংহাম এক স্থানীয় কৃষকের সহায়তায় মাচু পিচুর সন্ধান পান। কিন্তু ৪০০ বছর ধরে পরিত্যক্ত শহরের পাথরের কাঠামোগুলোর বেশিরভাগ অংশ গাছপালায় ঢাকায় পড়ে জঙ্গলের পরিণত হয়েছিল। বিংহামই মাচু পিচু সম্পর্কে লিখেন ‘দ্য লস্ট সিটি অব ইনকাস’ এবং এই শহরটি মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রে চলে আসে। বিংহাম তাঁর সংগৃহীত নমুনা ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে প্রদান করেন এবং এখনও এই শহরটি নিয়ে গবেষণা বিদ্যমান রয়েছে। পেরুর সরকার ১৯৮১ সালে মাচু পিচুকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। দুই বছর পরেই ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা প্রদান করে। ২০০৭ সালে পৃথিবীর নতুন সপ্তাশ্চর্যের একটি হিসেবে মাচু পিচু অন্তর্ভুক্ত হয়।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​