বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের সর্বোস্তরের মানুষ যেমন যুদ্ধ করেছে তেমনি অনেক বিদেশি বন্ধুদেরকেও আমরা পেয়েছি সহযোদ্ধা হিসেবে। তাদেরই একজন জর্জ হ্যারিসন। যিনি, বাংলারই আরেক গর্ব সেতার বাদক রবিশংকরের অনুরোধে বাংলাদেশের করুণ সময়ের সাথী হয়ে “বাংলা দেশ” গানটি তৈরি করেন।

বিশ্বের প্রথম চ্যারিটি সিঙ্গেলস বা দাতব্য কাজের উদ্দেশ্যে তৈরি গান “বাংলা দেশ” ‘৭১ সালে ২৮ জুলাই আমেরিকায় ইস্যু করা হয় এবং ১৯৭১ সালের আজকের দিনে যুক্তরাজ্যে মুক্তি পায়। এই গানটিকে সংগীতের ইতিহাসে অত্যন্ত জোরালো এক অন্যতম সামাজিক বিবৃতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৭১ এর জুন মাসে এক্স-বিটলস হাউসে থাকাকালীন সময়ে সেতার বাদক রবিশংকর এর সাথে দেখা হয় সদ্য বিটলস ছেড়ে আসা হ্যারিসনের। খুব দুঃখ নিয়ে রবিশংকর বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান যাকে বাঙালিরা বাংলাদেশ বলেই ডাকে, তার দুর্দশার কথা।

‘৭০ সালের নভেম্বরের সাইক্লোনের কারণে ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু আর পশ্চিম পাকিস্তানের ভ্রুক্ষেপহীনতা, ’৭১ এর ২৫ শে মার্চ অপারেশন সার্চলাইট নামে পশ্চিম পাকিস্তানের গণহত্যা চালানো, ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু, লাখো শরনার্থীর ভারতে প্রবেশ, না খেতে পেয়ে একইসাথে কলেরার প্রাদুর্ভাবে শরনার্থী শিবির গণকবরে পরিণত হওয়া সহ নানা ঘটনার কথা শুনে জর্জ হ্যারিসন সিদ্ধান্ত নেন কিছু করার। এমন সময় রবিশংকর ও হ্যারিসন আরো জানতে পারেন পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে অর্থনৈতিক ও অস্ত্রের সাহায্য পাঠাচ্ছে আমেরিকা। সচেতনতা সৃষ্টিতে হ্যারিসন দ্রুত পদক্ষেপ নিলেন। লিখলেন “বাংলা দেশ”। পিয়ানোতে দশ মিনিটের মধ্যে তুলে নিলেন গানটি। গানের শুরুতে তিনি বন্ধু রবিশংকরের অনুরোধের কথা নিয়ে আসেন। গানের শুরুটা ছিল ভারতীয় সংগীতের ‘আলাপ’ (গানের মূল বক্তব্যের ধীর সূচনা বক্তব্য) এর রক ঘরানার।

গানটির আলোড়ন তৈরি করা বার্তা “We’ve got to relieve Bangla Desh” ছিল বাংলাদেশের জন্য সহমর্মিতা সৃষ্টিতে অন্যতম সেরা বার্তা। নিউইয়র্কে কনসার্টের জন্য জুলাইয়ের শুরুতে লস এঞ্জেলসে দ্রুত রেকর্ড করা হয় গানটি। ১৯৭১ সালের ১ লা আগস্ট, ম্যাডিসন স্কয়ারে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’এ লিয়ন রাসেল (পিয়ানো), হোর্ন (স্যাক্সোফোন), স্ট্যার ও জিম কেল্টনার (ড্রামস), বিলি প্রেস্টন (অর্গান), চাক ফিন্ডলে, ক্ল্যাপ্টন, বব ডিলান, গানের দল ব্যাডফিঙ্গার এই গানের জন্য হ্যারিসন ও রবিশংকরের সাথে যোগ দেয়। বিটলসের কোম্পানি অ্যাপল, “বাংলা দেশ” এর কপি ডিস্ক এর সাথে প্রোমো ডিস্কও তৈরি করে যাতে রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার করা যায়।

ডিস্কের পিকচার স্লীভ বা কভারের জন্য ডিজাইনার টম উইক্স ব্যবহার করেন নিউইয়র্ক টাইমসে ওই সময় প্রকাশিত বাংলাদেশের ক্রাইসিস সম্পর্কিত আর্টিকেলের ছবি। সামনের কভারে আর্টিকেল গুলোর শিরোনামে ‘ঢাকার দুরাবস্থায় শকুনরা সবচেয়ে সুখী প্রাণি’, ‘পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের ‘wait and see’ পলিসি’ দেখা যায়। উপরে লেখা ‘We’ve Got to Relieve’ তার নিচে গানের শিরোনাম ‘Bangla Desh’। নিচে ইউনিসেফ নিউইয়র্ক সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে ‘George Harrison–Ravi Shankar Special Emergency Relief Fund’ এর বিবরণ। পেছনের কভারে একটি আবেগ মাখা ছবি যেখানে এক মা তার ক্ষুধার্ত সন্তানকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।

“বাংলাদেশ” ব্রিটেন ন্যাশনাল সিঙ্গেলস চার্টের ১০ম এবং আমেরিকার বিলবোর্ড হট ১০০ তে ২৩ তম স্থান অর্জন করে। ক্যাশ বক্স চার্টে ২০ তম ও রেকর্ড ওয়ার্ল্ডে ১৩ তম হয়। এই গানের মাধ্যমে করা রিলিফ প্রজেক্ট হয়ে ওঠে অনন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। আর কনসার্ট ফর বাংলাদেশ হয়ে ওঠে সংগীত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষীত মানবিক প্রচেষ্টা। এই গানের সৃষ্টিতে যা ঘটল সেটা রবিশংকরের কথাতেই সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়, “এক দিনের মধ্যে পুরো পৃথিবী জানলো বাংলাদেশের নাম। এটা ছিল চমৎকার একটা ঘটনা।”

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

একটি দেশের স্বাধীন হবার পিছে কত কত ইতিহাসই না থাকে। সেই দেশের জনগনের আত্মত্যাগ, তাদের সমস্ত প্রতিরোধ, তাদের সমস্ত অর্জন। কোন কোন

Read More

মাইকেল ফেল্পস: সাঁতারের জীবন্ত কিংবদন্তী

DC সুপারহিরো অ্যাকুয়াম্যানকে সবাই কম বেশি চেনে। বাস্তব জগতেও কিন্তু আছেন এমনই এক জলের নিচের সুপার হিরো। কারো কাছে তিনি বাল্টিমোরের বুলেট,

Read More

বাংলা দেশ: জর্জ হ্যারিসনের অমর সৃষ্টি

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীর এক অনুভূতি নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যার সাথে আর অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা চলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের

Read More

নাসা প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

৬২ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনে আমেরিকায় নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অন্যতম অগ্রপথিক। পৃথিবীতে যতগুলো স্পেস

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​