ইজরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তিচুক্তি: চরম দুই শত্রুর প্রথমবার এক হবার গল্প

ফিলিস্তিন ভূখন্ড নিয়ে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে সেই ১৯২০ সালের পর থেকেই। দুইপক্ষই দাবীদার এই ভূখন্ডের, যদিও ব্রিটিশদের সাথে সমঝোতার দোহাই দিয়ে এই ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় ইহুদিদের স্থায়ী বাসস্থান। ১৯৪৮ সালে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়, তখনই শীর্ষস্থানীয় পাঁচ আরব দেশ ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নিয়ে ইজরায়েল আক্রমণ করে। একে তেলসমৃদ্ধ দেশ, আবার সেই তেলের টাকায় গড়ে ওঠা মজবুত অর্থনীতি; ইজরায়েল তাই এই আক্রমণ কতটুকু প্রতিহত করতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ ছিলো অনেকেরই। 

তবে ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকা প্রতিবারই ছায়া হয়ে ছিলো তাদের পাশে। আর তাই বেশ ক’বার যুদ্ধ হলেও ইজরায়েলকে হটানো যায়নি, তাদের অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও তাতে তেমন একটা সফলতা আসেনি। যদিও প্রতিবারের যুদ্ধ শেষে উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয় দাবী করেছে, কিন্তু মূল যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ ভূমিহারা ফিলিস্তিনিদের নিজভূমে প্রত্যাবর্তন, তা আর হয়ে ওঠেনি। বরং প্রতিবারের যুদ্ধে ইজরায়েল একটু একটু করে দখল করে নিতে থাকে ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দকৃত এলাকাগুলো। বর্তমানে তাই ফিলিস্তিন ভূখন্ডের অস্তিত্বই বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে। 

১৯৬৪ সালে ফিলিস্তিনিদের মাতৃভূমি ফিরিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে জন্ম হয় প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশন – পিএলও এর। সেসময় স্বাধীন ফিলিস্তিন গঠনের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু ছোট ছোট দল তৈরি হয়। তাদের সবাইকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসাই ছিলো পিএলও এর উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের মুখপাত্র হিসেবেও কাজ করেছে এই সংগঠনটি। ১৯৬৭ সালের ৬ দিনের যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের অন্তর্গত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, গাজা উপত্যকা, সিনাই উপদ্বীপ আর গোলান মালভূমির অনেকটা অংশ দখল করে নেয় ইজরায়েল। 

এর মধ্যে পূর্ব জেরুজালেমকে তারা স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করে নিজ ভূখন্ডের সাথে, আর দখল করা অন্য অঞ্চলগুলোকে তাদের সামরিক বাহিনী দিয়ে শাসন করতে থাকে। অবশ্য সেসময় কিছু অংশ তারা ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু আরব লিগ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তা আর কার্যকর হয়নি। ১৯৭৯ সালে মিশরের সাথে শান্তিচুক্তির পর সিনাই পর্বত তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয় ইজরায়েল। যদিও দখলকৃত বাকী এলাকাগুলো আর ফেরত দেয়নি তারা। ইজরায়েলিদের একাংশ এসব অঞ্চলকে স্থায়ীভাবে ইজরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাতে থাকে, আর এই উদ্দেশ্যেই ৭০ এর দশকের শেষ দিকে তাদের অনেকেই এসব অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে। 

১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পিএলও এর তৎকালীন চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের নির্দেশে ইজরায়েলে বেশ কিছু গেরিলা হামলা চালানো হয়। এমনকি ইজরায়েলি নাগরিকদের ওপর ইজরায়েলে ও বিদেশেও সন্ত্রাসী হামলা চালায় পিএলও’র গেরিলা বাহিনী। ইজরায়েলও চুপ থাকেনি। পিএলওর হামলার জবাবে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাও পাল্টা আক্রমণ চালাতে থাকে ফিলিস্তিনের নেতা ও নাগরিকদের ওপর। ইজরায়েলের সেসব হামলা ধূর্ততা ও বর্বরতায় পিএলও’র চেয়ে অনেকগুণ বেশি ছিলো তা বলাই বাহুল্য। এসবের মধ্যেই ৭০ এর দশকের শুরুতেই পিএলও কে ফিলিস্তিনের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে থাকে আন্তর্জাতিক মহল। 

এতসবের পরেও উভয় পক্ষের সংঘর্ষ থেমে থাকেনি। বরং ৮০’র দশকের দিকে তা ক্রমশ বাড়তেই থাকে। ১৯৮২ সালে লেবাননে পিএলওর ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে তাদের হটিয়ে দেয় ইজরায়েলি সেনাবাহিনী। ১৯৮৭ সালে গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা শুরু করে “ইন্তিফাদা” আন্দোলন, যার শাব্দিক অর্থ “ঝেড়ে ফেলা”। মূলত ইজরায়েলিদের উৎখাতেই ছিলো এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। এরই মধ্যে জর্দানের রাজা হোসেন পশ্চিম তীরের প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দিলে ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর ইয়াসির আরাফাত তার নেতৃত্বে গাজা ও পশ্চিম তীর অঞ্চলকে নিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিনের ঘোষণা দেন। এর এক মাস পরেই আরাফাত সশস্ত্র হামলা ত্যাগ করে শান্তিচুক্তির আহ্বান জানান ইজরায়েলকে, এমনকি স্বাধীন দেশ হিসেবে একে স্বীকৃতিও দেন। 

তবে সমস্যা এখানেই মিটে যায়নি। পিএলও’র সাথে সরাসরি বৈঠকে বসতে অস্বীকৃতি জানায় ইজরায়েল। তবে ১৯৯১ সালে ইজরায়েলের কূটনীতিকগণ জর্দান-ফিলিস্তিন এর সমন্বিত প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠকে বসে। মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে এই বৈঠক সংঘটিত হয়। এরপর ১৯৯২ সালে ইজরায়েলের লেবার পার্টির নেতা ইজহাক রাবিন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি ঘোষণা দেন দ্রুততম সময়ে শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের। এমনকি দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে নতুন ইজরায়েলি আবাসনও বন্ধ করে দেন তিনি। এরই সূত্র ধরে পিএলওর ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে গোপন বৈঠকে বসে ইজরায়েল সরকার। অতঃপর এই আলোচনায় উভয়পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে ১৯৯৩ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ইজরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তিচুক্তি। 

আমেরিকার হোয়াইট হাউজের দক্ষিণ লনে অনুষ্ঠিত সেদিনের সভায় তৎকালীন ইজরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেজ আর পিএলও’র পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনের স্বায়ত্বশাসন বিষয়ক নীতিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীর এবং গাজা থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করে ইজরায়েল। পাশাপাশি ফিলিস্তিনকে এই অঞ্চলে স্বাধীন সরকার গঠনেরও সুযোগ দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক এই শান্তিচুক্তির পুরোটা জুড়েই সমন্বয়ক হিসেবে ছিলেন তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়র ও জিমি কার্টার। ইয়াসির আরাফাত ও ইজহাক রাবিন করমর্দন করে দুই দেশের পক্ষে শান্তিচুক্তি অনুমোদন করেন। প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি প্রত্যক্ষদর্শী সেদিন সাক্ষী হয়েছিলো দীর্ঘদিনের তিক্ততাপূর্ণ দুই শত্রুর এই মিলনের। 


Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​