সিবেলির যুদ্ধ: কন্সটান্টাইনের উত্থানের শুরু যেখানে

পৃথিবীর ইতিহাসে পশ্চিমা সভ্যতার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সমৃদ্ধিতে রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তৃত প্রভাব এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। হাজার বছরের গৌরবময় এই সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তরণের পথে রয়েছে নানা বাঁক। তাদের মধ্যে একটি তুলনামূলক ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো ‘সিবেলির যুদ্ধ’, যা রোমান কিংবদন্তি সম্রাট প্রথম কনস্ট্যান্টাইন (২৭২ – ৩৩৭ খ্রিস্টাব্দ) ও সম্রাট লিসিনিয়াসের (২৬৫ – ৩২৫ খ্রিস্টাব্দ) সংঘাতপূর্ণ এক দশকের প্রথম দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। আজকের এই দিনে, ৩১৪ খ্রিস্টাব্দে প্যানোনিয়ায় সংঘটিত হয় সিবেলির যুদ্ধ।


ঘটনার ভেতরে যেতে হলে আমাদের একটু ফিরে তাকাতে হবে ২৮৪ খ্রিস্টাব্দের রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থার দিকে, যখন সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ান বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সহজ করতে পূর্ব ও পশ্চিম এই দুটি ভাগে সাম্রাজ্যকে ভাগ করেন। ‘অগাস্টাস’ পদবি ধারণ করে নিজে পূর্ব গ্রিক ও তাঁর সহকর্মী ম্যাক্সিমিয়ান পশ্চিমা ল্যাটিন শাসন করছিলেন। পরে তাঁরা উভয়ই ‘সিজার’ পদবিতে আরো দুইজন উপ-সম্রাট নিয়োগ দেন এবং ‘টেট্রার্কি’ বা ‘চারের শাসন’ প্রচলন করেন।


কনস্ট্যান্টাইনের বাবা কনস্ট্যান্টিয়াস ছিলেন ম্যাক্সিমিয়ানের ‘সিজার’। ঘটনাচক্রে, দুই ‘অগাস্টাসে’র অবসর গ্রহণ ও কনস্ট্যান্টিয়াসের মৃত্যুর পর কনস্ট্যান্টাইন পশ্চিম সাম্রাজ্যের ‘সিজার’ হিসেবে নিযুক্ত হন। নানা জটিল ঘটনাপ্রবাহ ও ধারাবাহিক গৃহযুদ্ধের পর কনস্ট্যান্টাইন পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসন গ্রহণ করেন। অন্যদিকে পূর্ব সাম্রাজ্যের ‘অগাস্টাস’ গ্যালেরিয়াসকে হটিয়ে দিয়ে সিংহাসনে বসেন লিসিনিয়াস, কনস্ট্যান্টাইনের অন্যতম প্রতিপক্ষ। তখন বিশাল রোমান সাম্রাজ্যের দুই ভাগে তারাই শুধু শাসক। তবে কনস্ট্যান্টাইনের সৎবোনের সাথে লিসিনিয়াসের বৈবাহিক সম্পর্ক (৩১৩ খ্রিস্টাব্দ) দুই সম্রাটের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি।


বিভিন্ন সূত্র থেকে এটা বলা যায় যে, দুই সম্রাটই একে অপরের উপর আক্রমণের সুযোগ খুঁজছিলো। কনস্ট্যান্টাইন তাঁর সিজার হিসেবে নিয়োগ দেন ভগ্নিপতি ব্যাসিনাসকে। কিন্তু কনস্ট্যান্টাইনের কাছে ব্যাসিনাসের চক্রান্ত ধরা পরে যায়, যার মদদদাতা ছিল ব্যাসিনাসের ভাই সেনেসিওর। আর এই সেনেসিওর ছিলো লিসিনিয়াসের একান্ত সহযোগী। কনস্ট্যান্টাইন তখন সেনেসিওরকে হস্তান্তর করতে বললে লিসিনিয়ান তাতে অসম্মতি জানায়। আর এই সুযোগে সম্পূর্ণ রোমান সাম্রাজ্যের উপর আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের শাসক কনস্ট্যান্টাইন পূর্ব সাম্রাজ্যের শাসক লিসিনিয়াসের মুখোমুখি হন সিবেলির যুদ্ধে।


সেভ ও ড্রেভ নদীর মাঝামাঝিতে অবস্থিত সিবেলিতে (বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার ভিনকোভচি) কনস্ট্যান্টাইন ও লিসিনিয়াসের আস্তানার মধ্যে ৩৫০ কিলোমিটার জুড়ে ছিল এই যুদ্ধক্ষেত্র। বাজেন্টাইন নামেও খ্যাত কনস্ট্যান্টাইন ২০,০০০ সেনা নিয়ে যুদ্ধে নামেন, যেখানে লিসিনিয়াসের সৈন্যসংখ্যা ছিলো কনস্ট্যান্টাইনের সৈন্যের প্রায় দেড়গুণ । সারাদিনভর চলে যুদ্ধ। শুরুতে কিছুটা দূর থেকে গোলার আক্রমণ চললেও পরে দুই প্রতিপক্ষ মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়৷ দিনের প্রায় শেষ সময়ে কনস্ট্যান্টাইন নিজে তার সেনাবাহিনীর ডান অংশ থেকে আক্রমণ চালালে লিসিনিয়াসের পরাজয় নির্ধারিত হয়ে যায়। রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে লিসিনিয়াস তার অর্ধেকের বেশি সৈন্য হারান এবং বাধ্য হয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে প্রথমে সিরমিয়াম ও পরে ট্র‍্যাসে পালিয়ে যান।


৩১৪ সালের এই যুদ্ধের পর ৩১৬ সাল থেকে ৩২৪ সাল পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ একটা অস্থির সময়ের পর চূড়ান্তভাবে লিসিনিয়াসের পরাজয় ঘটে। এর মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হলেও তা ব্যর্থ হয়। তবে একটি সন্ধিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল তাদের মধ্যে যেখানে তাদের সন্তানদের সিজার পদে নিয়োগের শর্ত ছিল। তবে ৩২৪ সালের যুদ্ধের পর থেকে কনস্ট্যান্টাইন হয়ে ওঠেন ইউরোপীয় ও পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি আর তার অবদানেই তৈরি হয়েছিল অনন্য সমৃদ্ধির সভ্যতা রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​