প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার ছবিগুলোতে কখনোই ছবির বিষয়বস্তুকে ঠিকঠিক আকৃতিতে আঁকা হয় না। বরং মানবমনের গহীন কল্পনার মিশেলে এক নতুন রূপে মূর্ত হয় ছবিটি, যাতে প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে থাকে ছবির মূল বিষয়বস্তু। আর প্রথম যে শিল্পী স্নিগ্ধ অংকন শৈলী দিয়ে আমাদেরকে এই ইম্প্রেশনিজমের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, তিনি হলেন ক্লদ মোনে (Claude Monet)।

অস্কার ক্লদ মোনের জন্ম ১৮৪০ সালের ১৪ নভেম্বর, ফ্রান্সের প্যারিস শহরে। তিনি ছিলেন তাঁর পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান। মোনের বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে তার পারিবারিক ব্যবসা দেখবে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মোনের ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক অনেক বেশি ছিল। ১০ বছর বয়সে তিনি যোগ দেন স্থানীয় আর্ট স্কুলে। ১৫ বছর বয়সেই তিনি ফ্রান্স শহরে বিভিন্ন ব্যক্তির ক্যারিকেচার আঁকার মাধ্যমে বেশ খ্যাতি লাভ করেন। পরবর্তীতে এই ক্যারিকেচার তাকে অভিজ্ঞ এবং বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের সান্নিধ্যে আসতে সাহায্য করে।

১৮৫৭ সালে মায়ের মৃত্যুর পরে তিনি আর্ট স্কুল ত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে ১৮৬১ সালে তিনি আর্মিতে যোগদান করেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় অসুস্থ হয়ে পড়ায়, বাধ্য হয়ে আর্মি ছেড়ে দিয়ে তিনি আবারো আর্ট স্কুলে মনোনিবেশ করেন। তখন আর্ট স্কুলে গতানুগতিক অবজেক্টিভ বা রিয়ালিস্টিক পেইন্টিং শেখানো হতো, যা মোনের খুব একটা পছন্দের ছিল না। দ্বিতীয়বারের মতো স্কুল ত্যাগ করে মোন তাই নানা চিত্রশিল্পীর সাথে নিজের সখ্যতা বৃদ্ধি করতে থাকেন, যাতে করে ছবি আঁকায় ভিন্ন এবং নতুন নানা ধরনের কলা কৌশল নিয়ে পরীক্ষা চালানো যায়।

এই চিত্রশিল্পীরা প্রকৃতির ছবি আঁকতো। তাঁদের তুলির আচর ছিল খুব দ্রুত। এসব পেইন্টিং এর বৈশিষ্ট্য হলো, ছবি কতোটা নিখুঁত হবে তা মুখ্য বিষয় নয়, বরং প্রকৃতির আলো ও রঙের খেলা যেন দর্শনার্থীকে চোখে দেখানোর থেকে হৃদয়ে বেশি অনুভব করানো যায়। আর এ পথেই হাঁটলেন মোনে। তুলির আঁচড়ে নানা ধরনের ক্যানভাসের মাধ্যমে শিল্পমনা মানুষদের মন তিনি জয় করে নিলেন। ১৯৬৫ সালে মনের কিছু পেইন্টিং প্যারিসের বার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীর জন্য বাছাই করা হয়। তখন থেকে তার “ইম্প্রেশনিজম” সবার কাছে সমাদৃত হতে থাকে।

কিন্তু তখন তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল বেশ শোচনীয়। তাই ১৮৭০ সালে তিনি স্ত্রী ক্যামেল এর সাথে ইংল্যান্ড চলে যান। তাতেও তার আর্থিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। বাধ্য হয়ে পরের বছরই তিনি আবার ফ্রান্সে ফিরে আসেন। ১৮৭৯ সালে তাঁর স্ত্রী মারা যায়। এর কয়েক বছর পর তার পেইন্টিং বিক্রি বেশ বেড়ে যায় এবং তাঁর আর্থিক অবস্থানেও বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

১৮৮৩ সালে তিনি ফ্রান্সের জিভর্নির একটি বাড়িতে থাকা শুরু করেন যা তিনি ১৮৯০ সালে আশেপাশের শাপলা ফুলের পুকুরসহ কিনে ফেলেন। তিনি বাকি জীবন তাঁর এই বাড়ির বাগানের দৃশ্য এবং শাপলা-পুকুরের দৃশ্য এঁকে অতিবাহিত করেন। তিনি প্রায়ই একই দৃশ্য বারবার আঁকতেন, যাতে একই জায়গায় বিভিন্ন ঋতুর প্রভাবে প্রকৃতিতে রং ও আলোর পরিবর্তন ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে পারেন।

জীবদ্দশায় মোনে ২৫০০ এরও বেশি ছবি এঁকেছেন। তার বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে ইম্প্রেশন (Impression), সানরাইজ রনেন ক্যাথেড্রাল সিরিজ (Sunrise Rouen Cathedral Series), লন্ডন পার্লামেন্ট সিরিজ (London Parliament Series), ওয়াটার লিলি গার্ডেন (Water Lily Garden), হেয়স্ট্যাকস পপলারস (Haystacks Poplars) এর মতো চিত্রকর্ম গুলো বেশ সাড়া জাগিয়েছে। ১৯২৬ সালের ৫ ডিসেম্বর ৮৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর প্রায় শ’খানেক বছর পেরিয়ে গেলেও, এখনো শিল্পমনা মানুষদের কাছে, এমনকি পুরো বিশ্বের কাছে ক্লদ মোনে সর্বশ্রেষ্ঠ ইম্প্রেশনিস্ট হিসেবেই সমাদৃত।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনক চাঁপা চাকমা: বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের নারী রত্ন

কনক চাঁপা চাকমা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিত্রকলায় এক বিখ্যাত নাম।  তিনি তাঁর চিত্রকলায় মূলত ফুটিয়ে তোলেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন। তুলে ধরেন

Read More

ইবতিহাজ মোহাম্মদ: অলিম্পিক পদক জয়ী প্রথম মুসলিম নারী ফেন্সার

৪ ডিসেম্বর,১৯৮৫ সাল। স্থান- ম্যাপলউড, নিউ জার্সি। ইউজিন ও ডেনিস দম্পতির কোলজুড়ে এলো তৃতীয় সন্তান, ইবতিহাজ মোহাম্মদ। মুসলমান পরিবারের পরম সান্নিধ্যে, আন্তরিক

Read More

মাওরিঃ হাজার বছরের সভ্যতার ধারক ও বাহক

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর একটি হলো ‘মাওরি’। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস নিউজিল্যন্ডে। ২০১৩ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট অনুযায়ী নিউজিল্যন্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর

Read More

ব্রাজিলিয়ান কার্নিভাল: রঙিন মনের ঝলমলে প্রদর্শনী

উৎসব হলো মানুষের চিরচেনা ঐতিহ্যের চাদরে মোড়ানো মন ও প্রাণের মেলবন্ধন। আর প্রদর্শনী তুলে ধরে ধাবমান মুক্ত মনের এক চিলতে আবেগ। আর

Read More

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​

Skip to content