অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক উল্টোটা সত্য। ইংরেজি এনিমেশন থেকে আসা এনিমে এখন নিজেই আলাদা অর্থ বহন করে। জাপানিজ এবং পাশ্চাত্য এনিমেশনের মধ্যে মূল তফাৎ হচ্ছে, এনিমে ছেলে-বুড়ো সবার জন্যেই বানানো হয়, অন্যদিকে পশ্চিমা এনিমেশনগুলোর মূল দর্শক হচ্ছে কমবয়সী বাচ্চারা। অন্যদিকে, পশ্চিমা এনিমেশনে প্রোডাকশন হাউজকে বেশি মূল্য দেয়া হয়, যেখানে এনিমে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রোডাকশন হাউজের পাশাপাশি ডিরেক্টরকেও দেয়া হয় শিল্পীর মর্যাদা।

জাপানিজ এনিমেশনের ইতিহাস বেশ পুরোনো। অনেকের মতে, ১৯০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কেতসুদো শাসিন’ জাপানের প্রথম এনিমেটেড ফিল্ম, কিন্তু এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯১৭ থেকে জাপানে এনিমের চল শুরু হয়। জাপানিজ এনিমেশন তৎকালীন আমেরিকান এনিমেশনের চাইতে বেশি ব্যয়বহুল ছিলো, এবং ওয়াল্ট ডিজনির মত প্রচারণাও তাদের ছিলো না, ফলে শুরুতেই তাদের একের পর এক বাধার মুখোমুখি হতে হয়। ১৯২৯ এ জাপানে প্রথম সবাক এনিমে এবং ১৯৩২ এ রঙিন এনিমে মুক্তি পায়। এই সময়ে ওফুদি নোবুরো তার ছবি বাগুদাজো নো তোজুকো (Thief of Castle Baguda)- এর জন্যে বিশ্বব্যাপী পরিচিত লাভ করেন।

যদিও, তখনকার এনিমেগুলো বেশিরভাগই ছিলো আমেরিকা-বিরোধী নীতি নিয়ে। যেমন, জাপানিজ নেভি কর্তৃক যুদ্ধ শেষ হবার খানিকটা আগে প্রকাশ পাওয়া মোমোতারো: উমে নো শিনপেই (Momotaro’s Divine Sea Warriors)। ১৯৪৫ এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর, পাশার দান উল্টে গেলো। এনিমেশনে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে জাপান তখনকার প্রভাবশালী আমেরিকার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিতে শুরু করলো।

যদিও, অনেকের মাঝে এই ভুল ধারণা আছে যে এস্ট্রো বয় জাপানের প্রথম এনিমে টেলিভিশন সিরিজ, আদতে কিন্তু তা নয়। ষাটের দশকে টেলিভিশনে এনিমে প্রচারণা পেতে শুরু করে, একই সাথে আমেরিকান টিভিতেও এর দেখা পাওয়া যায়। ১৯৬০ সালে প্রচারিত থ্রি টেলস হচ্ছে প্রথম সম্প্রচারিত এনিমে। এনিমে নিয়ে কথা বলতে গেলে চলে আসে মাঙ্গার নাম। মাঙ্গাকে এক কথায় বলা যায় জাপানিজ কমিকস। আজকাল বেশিরভাগ এনিমেই মাঙ্গা থেকে বানানো হয়। ১৯৬৩ সালে, এমনই এক মাঙ্গা থেকে বানানো এনিমে সারাবিশ্বের দরবারে জাপানিজ এনিমেশনের নাম ছড়িয়ে দেয়। আধুনিক মাঙ্গার পিতা নামে খ্যাত, ওসুমা তেনকুজার অ্যাস্ট্রো বয় রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠে, এবং জাপানে তৈরি হয় এক নতুন রকম এনিমে ইন্ডাস্ট্রির।

মহাকাশ এবং বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নিয়ে তৈরি হতে শুরু করলো বিভিন্ন এনিমে। একই সময় বের হয় আরো ক্লাসিক কিছু এনিমে, মাহোতসুকি সারি (Sally the Witch), গেগেগে নো কিতারো (Kitaro of the Graveyard), এবং সাজায়ে সান। বিতর্কিত মুভি কিম্বা দ্যা হোয়াইট লায়নও মুক্তি পায় ১৯৬৫ সালে। সাজায়ে সান নিয়ে একটা মজার তথ্য হচ্ছে, ১৯৬৯ সালে প্রচার শুরু হওয়া এই এনিমেটি আজও টেলিভিশনে প্রচারিত হয়।

আশির দশকে, স্টার ওয়ার্স দিয়ে জর্জ লুকাস বিশ্বের মন জয় করে নেন। জাপানেও সেই সময় কিছু একটা ঘটছিলো। নতুন প্রজন্মের ডিরেক্টররা জাপানিজ এনিমের আর্ট স্টাইলে বদল আনেন। ১৯৮৫ সালে হায়াতো মিয়াজাকি প্রতিষ্ঠা করেন স্টুডিও ঘিবলি, এখনকার বিশ্বে অন্যতম পরিচিত এক নাম। অসংখ্য পুরষ্কার জেতা সহ তাদের বিখ্যাত মুভি স্পিরিটেড অ্যাওয়ে দিয়ে ২০০৩ সালে ঘিবলি নিজের ঝোলায় পুরে নিয়েছে আস্ত একটি অস্কার। মিয়াজাকির মতো, তার প্রজন্মের ইসাও তাকাহাতার গ্রেভ অব দ্যা ফায়ারফ্লাইজ, কাতসুহিরো ওতোমোর আকিরা এবং মামোরু ইশির গোস্ট ইন আ শেল নিজেদের কাজের জন্যে কুড়িয়েছে অসংখ্য সম্মাননা এবং বিশ্ব-পরিচিতি।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

প্রজন্ম সমতা কী এবং কেন ?

সাল ১৯৯৫। সেবছর চীনের বেইজিংয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লৈঙ্গিক সাম্য সংরক্ষকদের উপস্থিতিতে, নারীভিত্তিক চতুর্থ বিশ্ব কনফারেন্সে “বেইজিং প্লাটফর্ম ফর একশন’’-

Read More

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস ২০২১

আজ বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। প্রতিবছরের মতো বিশ্বব্যাপী পরিবেশ আন্দোলনকে বৈচিত্র্যময় এবং সক্রিয় করার লক্ষ্যে এবারও পালিত হচ্ছে দিনটি৷ ১৯৭০ সাল থেকে প্রতিবছর

Read More

কনক চাঁপা চাকমা: বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের নারী রত্ন

কনক চাঁপা চাকমা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিত্রকলায় এক বিখ্যাত নাম।  তিনি তাঁর চিত্রকলায় মূলত ফুটিয়ে তোলেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন। তুলে ধরেন

Read More

ইবতিহাজ মোহাম্মদ: অলিম্পিক পদক জয়ী প্রথম মুসলিম নারী ফেন্সার

৪ ডিসেম্বর,১৯৮৫ সাল। স্থান- ম্যাপলউড, নিউ জার্সি। ইউজিন ও ডেনিস দম্পতির কোলজুড়ে এলো তৃতীয় সন্তান, ইবতিহাজ মোহাম্মদ। মুসলমান পরিবারের পরম সান্নিধ্যে, আন্তরিক

Read More

মাওরিঃ হাজার বছরের সভ্যতার ধারক ও বাহক

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর একটি হলো ‘মাওরি’। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস নিউজিল্যন্ডে। ২০১৩ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট অনুযায়ী নিউজিল্যন্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর

Read More

ব্রাজিলিয়ান কার্নিভাল: রঙিন মনের ঝলমলে প্রদর্শনী

উৎসব হলো মানুষের চিরচেনা ঐতিহ্যের চাদরে মোড়ানো মন ও প্রাণের মেলবন্ধন। আর প্রদর্শনী তুলে ধরে ধাবমান মুক্ত মনের এক চিলতে আবেগ। আর

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​

Skip to content