মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই ছিলেন স্বদেশী ভাবধারার বিপ্লবী, যুদ্ধ করে ইংরেজ তাড়াবার মন্ত্রণা ছিলো তাঁদের সকলের রন্ধ্রে। তবে, এই প্রথাগত বিপ্লবের বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রম রাস্তা বেছে নেন এগারোজন যুবক। ফুটবলকে ধ্যানে নিয়ে ইংরেজদের সাথে লিপ্ত হন এক অভিনব যুদ্ধে। ১৯১১ সালের ২৯ জুলাই মোহনবাগান ফুটবল দলের অমর একাদশ ব্রিটিশদের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট ফুটবল দলকে পরাজিত করে আই এফ এ শিল্ড জিতে নেয়। ভারতবর্ষে সেদিন কেবল বাঙালির ফুটবলচেতনাই সমুচ্চিত হয় নি, ইতিহাস জেনেছিলো- ব্রিটিশরাজের সূর্যকেও অস্তমিত করবার ক্ষমতা বাঙালির আছে।

মোহনবাগানের পূর্বে ‘শোভাবাজার একাদশ’ উনবিংশ শতাব্দীতে ট্রেডস কাপ প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশদের একটি একক ম্যাচে হারিয়ে দিয়েছিলো, তবে সেই জয়ের ধারা অব্যাহত থাকেনি। মোহনবাগানের ‘আই এফ এ শিল্ড’ জয়ী সেই অমর দল টানা কয়েক ম্যাচে ব্রিটিশদের সকল দলকে হারিয়ে ফাইনালে গিয়ে পৌঁছায়। ফাইনালের অবিশ্বাস্য জয়ের পর মোহনবাগানের শ্রেষ্ঠত্বের কাছে ইউরোপের বাঘা বাঘা দল, স্বয়ং ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধিও পরাস্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

মোহনবাগানের কৃতিত্ব এককভাবে কাউকে যদি দিতে হয়, তিনি হলেন বরিশালে জন্ম নেয়া শিবদাস ভাদুড়ি। বড়দা বিজয়দাস ভাদুড়িও শিবদাসের নেতৃত্বে মোহনবাগানের মাঝমাঠে বল সামলাতেন। বৃষ্টিবাদল যেনো তাঁর খেলায় বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, তাই বাড়ির ছাদে পানি ঢেলে খেলার অনুশীলন করতেন বলে খ্যাতি পেয়েছিলেন ‘পিছল বাবু’ বলে। কলকাতার বিখ্যাত ব্যক্তি শৈলেন বোস ছিলেন শিবদাসের পরামর্শদাতা। শিবদাসের একান্ত প্রচেষ্টায় মোহনবাগান একাদশে কয়েকজন অমূল্য রত্ন খুঁজে পায়, তবে তাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।

মোহবাগানের গোলপোস্ট সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন হীরালাল মুখার্জি। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভুগতেন প্রায়সময়ই, তবে প্রত্যেকবারই শিবদাস তাঁকে সাহস দিতেন, সামলে নিতেন। রক্ষণভাগে ছিলেন ভূতি সুকুল, সুধীর চ্যাটার্জি, মনোমহন মুখার্জি ও নীলমাধব ভট্টাচার্য। ভূতি সুকুল ছিলেন দলের একমাত্র অবাঙ্গালি। সুধীর ছিলেন খ্রিস্টান, পড়াতেন এক মিশনারি কলেজে। মোহনবাগানে সকল খেলোয়াড় খালি পায়ে খেললেও একমাত্র তিনিই বুট পড়ে খেলতেন, সাহেবি কায়দায় চলাফেরা করতেন। মাঝমাঠে ভাদুড়ি ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে খেলতেন রাজেন সেনগুপ্ত, গোপনে স্বদেশীদের সাথে সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। ফরোয়ার্ড লাইনে ছিলেন তিনজন অদম্য খেলোয়াড়, যতীন্দ্রনাথ রায় (কানু), শ্রীশচন্দ্র সরকার (হাবুল) ও অভিলাষ ঘোষ। অভিলাষ ঘোষ পড়তেন স্কটিশ কলেজে, রাজেন সেনগুপ্তই তাঁকে ক্লাবে পরিচয় করিয়ে দেন।

সেমিফাইনালের ম্যাচে বিপক্ষ দলের গোলকিপারকে অনিচ্ছাকৃত এক ফাউল করে বসেন অভিলাষ ঘোষ। তাঁর খেলার ধরণ দেখে পূর্বেই ব্রিটিশরা তাঁকে ‘কালো দানব’ বলে ডাকতো। তাই তাঁকে না খেলানোর হাজারো পাঁয়তারা করলেও ব্যর্থ হয় ব্রিটিশরা, ম্যাচ রেফারিকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে বলা হলেও তিনি অনিচ্ছাকৃত ফাউল দাবি করে অভিযোগ করতে অস্বীকার করেন। ফাইনালের নির্ধারিত দিনে কলকাতার মোহনবাগান মাঠ দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। শোনা যায়, কোনো এক জমিদার নাকি তার বহু সাধনার জমি বিক্রি করে সামনে থেকে খেলা দেখার মনোবাসনা পূর্ণ করেন। মাঠে তিল ধারণের জায়গা তো ছিলোই না, উল্টো ম্যাচের স্কোর অনেকগুলো ঘুড়িতে ঝুলিয়েও তেষ্টা মেটানো যায়নি বাঙালির। কোমরে গামছা পেঁচিয়ে গাছের সাথে ঝুলে থাকা দর্শকই প্রমাণ করে মোহনবাগান ও ইস্ট ইয়র্কশায়ারের ম্যাচ কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

খেলার প্রথমার্ধে জমজমাট লড়াই হলেও ইয়র্কশায়ারের ক্যাপ্টেন জ্যাকসনের গোলে অনেকটা থেমে যায় মাঠে থাকা দর্শকদের উচ্ছ্বাস। রাজেনের করা ফাউলে জ্যাকসন সহজেই ফ্রি কিক নেন, তবে গোলটা হয় ভূতি সুকুলের ভুলের কারণে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কানু-হাবুল-অভিলাষের পা থেকে বল কেড়ে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছিলো না ইয়র্কশায়ার। এর মধ্যেই একটি গোল করেন ক্যাপ্টেন শিবদাস ভাদুড়ি। পরবর্তীতে তাঁরই অ্যাসিস্টে অভিলাষ খেলা শেষ হওয়ার দু’মিনিট আগেই জয়সূচক গোলটি করেন। এই জয়ের মাধ্যমে কেবল ‘এফ এ শিল্ড’ই নয়, ইতিহাসে ব্রিটিশদের বিনাযুদ্ধে পরাস্ত করবার এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করে জায়গা করে নেয় ‘মোহনবাগান একাদশ’।

ইতিহাস সেই মোহনবাগান একাদশকে এক অনন্য সম্মান দিয়েছে, ভারতবর্ষের মানুষজন তাঁদের মনে রেখেছে সর্বোচ্চ সম্মানে। তবে ব্রিটিশরাজের অজেয় মনোভাবকে পরাস্ত করবার মাধ্যমে এক নতুন উদ্যাম এনে দিয়েছিলেন তাঁরা। বঙ্গভঙ্গ রদ হবার প্রাক্কালে এই জয়ের মাধ্যমে তারা দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে ধর্ম-সংস্কৃতি কিংবা অন্য কোনো কিছু দিয়েই বাঙালি-বোধ দমাবার সামর্থ্য কারো নেই।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​