সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে ভরিয়ে তুলছে বুকের ভেতরটা। হঠাৎই বর্তমানকে দুমড়ে মুচড়ে নিজের অস্তিত্বকে টেনে এনে দাঁড় করালো এক দীর্ঘ সড়কের সামনে। সড়কের দুইধার দিয়ে মানুষের ঢল, প্রচন্ড আতঙ্কে একমাত্র সম্বল এই প্রাণটাকে আঁকড়ে ধরে অবিরাম ছুটে চলেছে এক অজানা গন্তব্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। মুহুর্তেই নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হতে থাকে। এই ঘোর থেকে নিজেকে বের করে আনাটা খুবই কষ্টকর। সেই সড়কটির নাম ‘যশোর রোড’। ১৯৭১ সালের মধ্য সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের কলকাতার সংযোগকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যশোর রোডের করুণ চিত্র স্বচক্ষে দেখে আমেরিকান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। বাংলাদেশের স্বধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর পর এই কবিতার আবেদন আজও অমলীন।

ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করা আমেরিকান কবি, গীতিকার, আলোকচিত্রী ও মঞ্চ অভিনেতা অ্যালেন গিন্সবার্গ যুদ্ধবিরোধী হিসেবেও সুপরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় অ্যালেন গিন্সবার্গ কোলকাতায় এসে তাঁর সাহিত্যিক বন্ধুদের নিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনীর নির্মমতা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও বিবিসির সংবাদদাতা গীতা মেহতাকে সঙ্গী করে কলকাতার আশেপাশের শরনার্থী শিবিরে ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি। অতিবৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া অতন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই যশোর রোড দিয়ে বাংলাদেশের লাখো যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষকে শরনার্থী শিবিরে যেতে দেখেছেন। শরনার্থী শিবিরে থাকা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, অনাহার, অপুষ্টি, করুণ মৃত্যু তাঁর কবি মনকে নাড়া দিয়েছে প্রচন্ডভাবে। এই করুণ অভিজ্ঞতাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি লিখতে। পরবর্তীতে অ্যালেন গিন্সবার্গ আমেরিকায় ফিরে গিয়ে নিউইয়র্কের এক কবিতা পাঠের আসরে কবিতাটি উপস্থাপন করেন। এরপর বন্ধু বব ডিলানের সাহায্যে কবিতাটিকে গানে রূপ দেন। বব ডিলান, জোয়ান বায়েজ, জর্জ হ্যারিসন ও পন্ডিত রবি শংকরের সাথে তিনিও “কন্সার্ট ফর বাংলাদেশ”-এ যোগ দেন। তাঁর ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। ছোট্ট এই দেশের মুক্তির জন্য একাত্মতা প্রকাশ করেন। বর্তমানে বাংলা ভাবানুবাদে যে গানটি শোনা হয় সেটি মূলত সঙ্গীতশিল্পী মৌসুমি ভৌমিকের কন্ঠে নিজের সুরে, নিজের করা বাংলা ভাবানুবাদে।

অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর কবিতায় পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যশোর রোড ও শরনার্থী শিবিরে থাকা বিভিন্ন বয়সী মানুষের করুণ অবস্থা বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেছেন। কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে হাজারো মানুষের মর্মভেদী হাহাকার। কবিতার ভাষায় তাঁর মমতা ও হৃদ্যতার প্রকাশ এতোটাই গভীর যে, মানুষের কান্নায় ব্যথিত কবির হৃদয় আমাদের কাছে অনায়াসে ধরা পড়ে। শত নিষ্পাপ শিশুর চোখের সেই আবেগহীন বড় বড় চাহনী যেন কবির হৃদয়ে কাটার মতো বিঁধে আছে। কবিতায় শিশু ও তার পরিবারে থাকা মা-বাবা, ভাই, দাদা- দাদী সকল বয়সী মানুষের দুর্দশার কথা উঠে এসেছে একে একে। সকল বয়সী মানুষের অমানবিক সংগ্রাম ও অবর্ণনীয় মৃত্যুর কষ্টও কবিতায় উপস্থাপিত হয়েছে। কবি উপহাস ভরা কিছু কঠোর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন বিশ্ববাসীর কাছে। সংগীতশিল্পী মৌসুমি ভৌমিকের দরদী কন্ঠে গাওয়া গানে সে প্রশ্নগুলোর আবেদন কল্পনাতীত। “এ কেমন বাঁচা?”, “এত এত লোক শুধু কেন মরে?”, “নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে?” এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে অ্যালেন গিন্সবার্গ সারা পৃথিবীর মানুষের মানবিকতায় নাড়া দিতে চেয়েছেন।

মৌসুমি ভৌমিকের আগে খান মোহাম্মদ ফারাবী এই কবিতাকে বাংলায় অনুবাদ করেন। ১৯৯৯ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ তাঁর চলচ্চিত্র “মুক্তির কথা”এ গান হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খান মোহাম্মদ ফারাবীর করা ভাবানুবাদকে গানে রূপ দেয়া ছিলো কষ্টসাধ্য। এরপর সংগীতশিল্পী মৌসুমি ভৌমিক কবিতাটিকে গানে রূপ দেয়ার গুরুভার নিজ কাঁধে তুলে নেন। অ্যালেন গিন্সবার্গের এই কবিতা পরবর্তীতে তাঁর “ফল অব আমেরিকা : পয়েম অব দিস স্টেটস, ১৯৬৫-১৯৭১” বিখ্যাত বইয়ে অন্তর্ভূক্ত হয় এবং এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পায়। অ্যালেন গিন্সবার্গ নিজের দেশের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে এই দেশের জন্য, এই দেশের মানুষের জন্য কলম তুলে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ চিরকাল স্মরণ করবে তার অন্যতম বন্ধু অ্যালেন গিন্সবার্গকে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

মোহনবাগান ‘অমর’ একাদশের এফ এ শিল্ড জয়!

স্বদেশী বিপ্লবীরা ভাবতো, কেবল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ব্রিটিশরাজের সূর্য অস্তমিত করা সম্ভব। মঙ্গল পাণ্ডে থেকে ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে ভগৎ সিং-সকলেই

Read More

অ্যানিমে: বিনোদন জগতের সুবিশাল এক রাজ্য

জাপানিজ এনিমেশন, বা এনিমে শব্দটি আজকাল বেশ পরিচিত আমাদের কাছে। জাপানে যদিও এনিমে মানে সকল প্রকার এনিমেশনই বুঝায়, বাইরের দেশগুলোতে তার ঠিক

Read More

প্রতিচ্ছায়াবাদের রূপকার ক্লদ মোনে

ইম্প্রেশনিজম (Impressionism) শব্দটির আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রতিচ্ছায়াবাদ”। চিত্রাঙ্কন জগতে ‘ইম্প্রেশনিজম’ মানে হলো ইঙ্গিতে ছবি আঁকা। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধারার

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​