ব্রাজিলিয়ান কার্নিভাল: রঙিন মনের ঝলমলে প্রদর্শনী

উৎসব হলো মানুষের চিরচেনা ঐতিহ্যের চাদরে মোড়ানো মন ও প্রাণের মেলবন্ধন। আর প্রদর্শনী তুলে ধরে ধাবমান মুক্ত মনের এক চিলতে আবেগ। আর এই দুইয়ের মিলনেই যেন পৃথিবীতে নেমে আসে স্বর্গীয় আনন্দ। উৎসব ও প্রদর্শনীর মিলনস্থল হিসেবে উৎকৃষ্ট এক উদাহরণ হলো কার্নিভাল বা রোমান ক্যাথলিক উৎসব। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, আকর্ষণীয়, জনপ্রিয় ও সর্বজন নন্দিত এক কার্নিভাল হলো দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে আয়োজিত বার্ষিক আনন্দ উৎসব “রিও কার্নিভাল”। এছাড়াও এই দেশটিতে রয়েছে “রিসিফি ও ওলিন্ডা কার্নিভাল”, “বাহিয়া কার্নিভাল”, “সাও পাওলো কার্নিভাল”, “ফ্লোরিয়ানোপোলিস কার্নিভাল” এবং “ফোর্টালিজা কার্নিভাল”।

কতিপয় বিশেষজ্ঞের ধারণা অনুযায়ী, কার্নিভাল ছিল গ্রীক বসন্ত উৎসব। জনপ্রিয় পানীয় ওয়াইনের গ্রীক দেবতা ‘ডায়োনাইসাস’ এর সম্মানে এই উৎসব বা কার্নিভাল আয়োজিত হতো। পরবর্তীতে রোমান সভ্যতা এই সংস্কৃতিকে পরম আন্তরিকতায় আলিঙ্গন করে। ওয়াইনের রোমান দেবতা ব্যাকাস ও ফসলের দেবতা শনিকে স্মরণ করে “স্যাটারনালিয়া” নামে বিশাল ভোজের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় কার্নিভালের যাত্রা। শুরুর দিকে মনিব ও দাসদের মধ্যে পোশাক অদল বদল করে সকলে ওয়াইন উপভোগ করতে করতে পুরো দিন অতিবাহিত করত। পরবর্তীতে রোমান ক্যাথলিক চার্চ এই ভোজের আয়োজনকে আরো পরিমার্জন করেন।

একটি বিশেষ সময়ের আগমনকে কেন্দ্র করে শুরু হতো উৎসব। ইস্টার সানডের আগের ঠিক ৪০ দিনের এই বিশেষ সময়টি ‘লেন্ট’ নামে পরিচিত। এই সময়টাতে রোমান ক্যাথলিক ও কিছু সংখ্যক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকার একধরণের সংস্কৃতির চর্চা করত, এখনো করে থাকে যা “কার্নিলিভার” হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখান থেকেই আসলে এই ‘কার্নিভাল’ নামকরণ। ধীরে ধীরে শুধু ধর্মীয় আবরণের খোল থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে কার্নিভালের রীতি নীতি।

শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৮ শতকের দিকে আয়োজিত কার্নিভালগুলোতে স্থানীয় ও পর্যটক সকলেই রাস্তায় বেরিয়ে পানি ঢালা, কাদামাটি ও খাবার ছোড়াছুড়ি করে উৎসব উদযাপন করতো। কিন্তু ঝামেলা ও বিশৃঙ্খলার কোনো অন্ত ছিল না। উনবিংশ শতাব্দী থেকে নতুন মাত্রায় সম্রাটসহ নানা উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে আরো সুসংহত প্যারেডের আয়োজন হতে থাকে। সকলে মুখোশ ও বিলাসী পোশাক পরে ঐতিহ্যবাহী গানের সাথে প্যারেডে অংশ নিত। সেই শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে বিশেষ ধরণের মুখোশ ‘মাস্করেড’ পরে বল নাচ, ওয়াল্টজ ও পোল্কা নাচের প্রচলন। শতাব্দীর শেষে এসে প্যারেডে যুক্ত হয় সর্বসাধারনের অংশগ্রহণ- বিশেষ সাজে, বিশেষ গানে, বিশেষ সুরে এবং বিশেষ কন্সেপ্ট বা বিষয়কে কেন্দ্র করে।

১৯১৭ সাল থেকে কার্নিভালের প্রধান আকর্ষণগুলোর একটি হিসেবে পরিগণিত হয় অ্যাফ্রো-ব্রাজিলিয়ান ধারার বিশেষ ঐতিহ্যবাহী নাচ ‘সাম্বা’। তখন থেকেই সাম্বা নাচ হয়ে ওঠে ব্রাজিলিয়ান কার্নিভাল, বিশেষ করে রিও কার্নিভালের এক অবিচ্ছেদ্য একক। সাম্বা স্কুলগুলো সেই ১৯২৮ সাল থেকে কার্নিভালের প্যারেডে অসাধারণ সব সাম্বা নাচ পরিবেশন করে যাচ্ছে। ১৯৮৪ সাল থেকে নির্ধারিত স্টেডিয়াম সাম্বাড্রোমোতে সর্বমোট ১৩ টি সাম্বা স্কুলের ৭৫ মিনিটের এক একটি চোখ জুড়ানো পরিবেশনার উপর প্রতিযোগিতারও আয়োজন হয়ে থাকে। শুধু সাম্বা নাচই নয়, কার্নিভালের মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে কোপাকাবানা প্যালেস হোটেলের ম্যাজিক বল নৃত্যের আয়োজন, স্ট্রিট পার্টি যারা একেকটি দল গঠন করে নিজস্ব বাদ্য বাজাতে বাজাতে সাম্বা গানের সুরে নিজেদের মতো করেই আনন্দ করতে থাকে।

লেন্টের প্রথম দিন হলো ক্যাথলিকদের বিশেষ প্রার্থনার দিন, যা ‘অ্যাশ ওয়েডনাসডে’ বা “ছাই বুধবার” নামে পরিচিত। এই প্রার্থনার দিনের আগের পাঁচটি দিন ধরেই উদযাপিত হতে থাকে ব্রাজিলিয়ান কার্নিভাল। এই অল্প কয়েকটি দিনে পৃথিবী বিখ্যাত রিও কার্নিভাল, রিও কার্নিভালের ছোট ভাই সাও পাওলো কার্নিভাল ছাড়াও অন্যান্য সব কার্নিভালে অংশ নেয়া নানা বয়সের লক্ষাধিক স্থানীয় ও পর্যটক আবালবৃদ্ধবণিতা সকলে যেন বুঁদ হয়ে থাকে অপরিসীম আনন্দে। প্রতি বছর মন জয় করে নেয়া এই অল্প কয়েকটি দিনের জন্যই সারা পৃথিবী অপেক্ষা করে থাকে অধীর আগ্রহে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনক চাঁপা চাকমা: বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের নারী রত্ন

কনক চাঁপা চাকমা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিত্রকলায় এক বিখ্যাত নাম।  তিনি তাঁর চিত্রকলায় মূলত ফুটিয়ে তোলেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন। তুলে ধরেন

Read More

ইবতিহাজ মোহাম্মদ: অলিম্পিক পদক জয়ী প্রথম মুসলিম নারী ফেন্সার

৪ ডিসেম্বর,১৯৮৫ সাল। স্থান- ম্যাপলউড, নিউ জার্সি। ইউজিন ও ডেনিস দম্পতির কোলজুড়ে এলো তৃতীয় সন্তান, ইবতিহাজ মোহাম্মদ। মুসলমান পরিবারের পরম সান্নিধ্যে, আন্তরিক

Read More

মাওরিঃ হাজার বছরের সভ্যতার ধারক ও বাহক

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর একটি হলো ‘মাওরি’। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস নিউজিল্যন্ডে। ২০১৩ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট অনুযায়ী নিউজিল্যন্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর

Read More

ব্রাজিলিয়ান কার্নিভাল: রঙিন মনের ঝলমলে প্রদর্শনী

উৎসব হলো মানুষের চিরচেনা ঐতিহ্যের চাদরে মোড়ানো মন ও প্রাণের মেলবন্ধন। আর প্রদর্শনী তুলে ধরে ধাবমান মুক্ত মনের এক চিলতে আবেগ। আর

Read More

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​

Skip to content