মাওরিঃ হাজার বছরের সভ্যতার ধারক ও বাহক

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর একটি হলো ‘মাওরি’। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস নিউজিল্যন্ডে। ২০১৩ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট অনুযায়ী নিউজিল্যন্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ লক্ষের অধিক। ধারণা করা হয়, এই গোষ্ঠীর আদি নিবাস পূর্ব পলিনেশিয়ায়, আনুমানিক ১২৫০ থেকে ১৩০০ সালের দিকে এই জনগোষ্ঠী সমুদ্রপথে নিউজিল্যান্ডে প্রবেশ করে এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে।

মাওরি নৃগোষ্ঠীর রয়েছে স্বকীয় সংস্কৃতি ও ভাষা। ‘মাওরি’ ভাষা বিশ্বের প্রাচীনতম ভাষাগুলোর একটি। নিউজিল্যান্ডের সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজির পাশাপাশি ‘মাওরি’ ভাষাও অবস্থান করে নিয়েছে। মাওরি জনগোষ্ঠী মূলত কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত হলেও যুদ্ধবিদ্যায় এরা বেশ পারদর্শী।

সতেরো শতকের দিকে নিউজিল্যান্ডে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে এবং যখন দেশটি ব্রিটেনের উপনিবেশে পরিণত হয় তখন মাওরিদের সাথে ব্রিটিশদের সংঘাত শুরু হয়। দীর্ঘমেয়াদী এ সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে ১৮৪০ সালের ওয়াটাংগি চুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু ১৮৬০ সালের দিকে জমির বণ্টন ও অতিরিক্ত টোল আদায়ের কারণে ইউরোপীয়দের সাথে মাওরিদের আবারো বিবাদের সূত্রপাত ঘটে ।

পলিনেশিয়ান সংস্কৃতির ছাপ মাওরিদের উপর স্পষ্ট। এ জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছে সমুদ্রকে কেন্দ্র করে। তবে ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে এসে খ্রিস্টধর্মের প্রভাবও পড়েছে তাদের জীবনব্যবস্থায়। নাচ ও গানের দক্ষতার জন্য মাওরিদের বিশেষ সুনাম রয়েছে। মাওরিদের অন্যতম বিখ্যাত একটি নাচের নাম হাকা।

নৃবিজ্ঞানী মার্সেল মস মাওরি সমাজে উপহার আদান-প্রদানের বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি এ সংক্রান্ত আলোচনা তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Gift’ এ লিপিবদ্ধ করেন। মাওরি সমাজে এ বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, প্রতিটি উপহারেরই আত্মা (Spirit) আছে, যেটিকে তারা হাউ (hau) বলে অভিহিত করে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী উপহারের বিনিময়ে যদি পুনরায় উপহার প্রদান করা না হয় তবে হাউ কোন ব্যক্তিবিশেষের ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা রাখে। তাই মাওরি সমাজে চক্রাকারে উপহার আদান-প্রদান চলতেই থাকে।

দীর্ঘসময় অবহেলিত হয়ে থাকলেও নিউজিল্যান্ডের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মাওরিদের অবস্থান বর্তমানে শক্তিশালী হচ্ছে। দেশটির পার্লামেন্টে মাওরিদের জন্য আসন সংরক্ষিত রয়েছে। গত ৩০ বছরে রাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সই হয়েছে ৮৭টি চুক্তি। যা এখন পর্যন্ত মাওরিদের সহযোগিতা ও উন্নয়নে কাজ করছে। নিউজিল্যান্ডের জাতীয় পর্যায়ের খেলাধুলাতেও মাওরিদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় এখন বেশি।

হাজার বছরের সভ্যতার ধারক ও বাহক মাওরি জনগোষ্ঠী। নিউজিল্যান্ডের মূলধারার নাগরিকেরা তাদের দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তথা মিশ্র সংস্কৃতির জন্য গর্ব অনুভব করে।

তথ্যসূত্র:
Mauss, Marcel; The Gift (1967), Norton & Company.
Islam Tauhidul,15 dec 2018, The Daily prothom Alo

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

কনক চাঁপা চাকমা: বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের নারী রত্ন

কনক চাঁপা চাকমা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিত্রকলায় এক বিখ্যাত নাম।  তিনি তাঁর চিত্রকলায় মূলত ফুটিয়ে তোলেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন। তুলে ধরেন

Read More

ইবতিহাজ মোহাম্মদ: অলিম্পিক পদক জয়ী প্রথম মুসলিম নারী ফেন্সার

৪ ডিসেম্বর,১৯৮৫ সাল। স্থান- ম্যাপলউড, নিউ জার্সি। ইউজিন ও ডেনিস দম্পতির কোলজুড়ে এলো তৃতীয় সন্তান, ইবতিহাজ মোহাম্মদ। মুসলমান পরিবারের পরম সান্নিধ্যে, আন্তরিক

Read More

মাওরিঃ হাজার বছরের সভ্যতার ধারক ও বাহক

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর একটি হলো ‘মাওরি’। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস নিউজিল্যন্ডে। ২০১৩ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট অনুযায়ী নিউজিল্যন্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর

Read More

ব্রাজিলিয়ান কার্নিভাল: রঙিন মনের ঝলমলে প্রদর্শনী

উৎসব হলো মানুষের চিরচেনা ঐতিহ্যের চাদরে মোড়ানো মন ও প্রাণের মেলবন্ধন। আর প্রদর্শনী তুলে ধরে ধাবমান মুক্ত মনের এক চিলতে আবেগ। আর

Read More

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড : পরম বন্ধুর অমূল্য উপহার

পংক্তি সংখ্যা ১৫২। ধারণ করে আছে বাংলাদেশের অপাংক্তেয় এক আবেগকে। প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। পংক্তির পর পংক্তি এক আশ্চর্য অনুভূতিতে

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​

Skip to content