ইবতিহাজ মোহাম্মদ: অলিম্পিক পদক জয়ী প্রথম মুসলিম নারী ফেন্সার

৪ ডিসেম্বর,১৯৮৫ সাল। স্থান- ম্যাপলউড, নিউ জার্সি। ইউজিন ও ডেনিস দম্পতির কোলজুড়ে এলো তৃতীয় সন্তান, ইবতিহাজ মোহাম্মদ। মুসলমান পরিবারের পরম সান্নিধ্যে, আন্তরিক পরিবেশে ধর্মীয় অনুশাসনকে ধারণ করে বেড়ে ওঠা সেই কন্যা সন্তান, ইবতিহাজ মোহাম্মদ আজ ইতিহাস রচনাকারী এক সফল নারী। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর অনুশীলন দিয়ে জিতে নিয়েছেন ফেন্সিং এর মতো একটি খেলায় জাতীয় ও অলিম্পিক পদকসহ অগণিত সম্মাননা। আর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে জয় করেছেন গোটা পৃথিবী।
মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তার জীবনের লক্ষ্য। হতে চেয়েছিলেন খেলোয়াড়। প্রচন্ড আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন ফেন্সিং খেলার প্রতি। তার ইচ্ছাকে সায় দিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মা ডেনিস মোহাম্মদ। ইচ্ছায় বাঁধা না পড়ার কারণ হিসেবে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিলো মুসলমান নারী হিসেবে ইবতিহাজের পোশাক নির্বাচন। সহজ কথায় হিজাব পরে খেলাতে পারার স্বাধীনতা থাকায় ইবতিহাজ এবং তার পরিবার পছন্দ করেছেন ফেন্সিং এর মতো একটি খেলাকে। ছোটবেলা থেকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন লক্ষ্যপানে। তবে সহজ ধারায় নয়, বেছে নিয়েছিলেন ফেন্সিং এর তিন ডিসিপ্লিনের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগামী ও বলপ্রয়োগকারী ফেন্সিং ডিসিপ্লিন “সাবার”।
২০০৯ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিয়ান আখেনাতেন “আখি” স্পেন্সার-এল কর্তৃক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ার মাধ্যমে, ফেন্সিং খেলোয়ার হিসেবে নিজেকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান ইবতিহাজ। জিতে নেন জাতীয় খেতাব। পাঁচ বারের সিনিয়র ওয়ার্ল্ড টিমের পদকপ্রাপ্ত ইবতিহাজ, রাশিয়ার কাজানে ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দলগত সোনা জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন। সেই বছরেই চালু করেন নিজস্ব পোশাক সংস্থা লুয়েলা, উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিনয়ী এবং ফ্যাশনেবল পোশাকের প্রচলন। পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে, তিনি বিশ্বকাপের সার্কিটের দল এবং স্বতন্ত্র ইভেন্ট উভয়ের জন্যই অনেক পদক অর্জন করেছেন।
২০১২ সালে তিনি মুসলিম বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত হন। কঠোর চেষ্টায় নিজেকে তিনি নিয়ে গেছেন অলিম্পিকের মতো আসরে। মুসলমান মহিলাদের কাছে এক নতুন উচ্চতার সন্ধান দেবার জন্যই ইবতিহাজ নিজেকে ভেঙেচুরে গড়েছেন বারবার। খেলাধুলার নারী মুখপাত্র হিসেবেও কাজ করেছেন ইবতিহাজ। তিনি ক্রীড়া উদ্যোক্তাদের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য বিভাগীয় পর্যায়ে ক্ষমতায়নকারী মহিলা ও মেয়েদের পক্ষ থেকেই কাজ করেছেন। তিনি সভা ও সংলাপে যোগ দিতে ভ্রমণ করেছেন বিভিন্ন দেশে। এসব সংলাপের বিষয়বস্তু ছিল সর্বস্তরে খেলাধুলা ও শিক্ষার গুরুত্ব।
ইবতিহাজ মোহাম্মদ প্রাথমিকভাবে পরিচিত আমেরিকান সাবার ফেন্সার এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ফেন্সিং দলের সদস্য হিসেবে। কিন্তু তার সকল পরিচয়ের মধ্যে একটি পরিচয়ে তিনি সবার প্রথমে। তিনি রিও অলিম্পিকে অংশ নেয়ার সময় খ্যাতি পেয়েছিলেন হিজাব পরিহিত প্রথম মুসলিম আমেরিকান নারী ফেন্সিং খেলোয়াড় হিসাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহিলাদের সাবার ফেন্সিং দলের হয়ে ব্রোঞ্জ জিতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে রচনা করলেন নতুন ইতিহাস। অলিম্পিক এই পদকপ্রাপ্ত অনন্যা এই নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তৈরি করা হয়েছে হিজাব পরিহিত বার্বি পুতুল। ইবতিহাজ মোহাম্মদের ছেলেবেলার খেলার সাথীর নতুন এই রূপ তার কাছে যেন “ শৈশবের স্বপ্ন বাস্তব“ হওয়ার সমান।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও

Latest Articles

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস ২০২১

আজ বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। প্রতিবছরের মতো বিশ্বব্যাপী পরিবেশ আন্দোলনকে বৈচিত্র্যময় এবং সক্রিয় করার লক্ষ্যে এবারও পালিত হচ্ছে দিনটি৷ ১৯৭০ সাল থেকে প্রতিবছর

Read More

কনক চাঁপা চাকমা: বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের নারী রত্ন

কনক চাঁপা চাকমা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিত্রকলায় এক বিখ্যাত নাম।  তিনি তাঁর চিত্রকলায় মূলত ফুটিয়ে তোলেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন। তুলে ধরেন

Read More

ইবতিহাজ মোহাম্মদ: অলিম্পিক পদক জয়ী প্রথম মুসলিম নারী ফেন্সার

৪ ডিসেম্বর,১৯৮৫ সাল। স্থান- ম্যাপলউড, নিউ জার্সি। ইউজিন ও ডেনিস দম্পতির কোলজুড়ে এলো তৃতীয় সন্তান, ইবতিহাজ মোহাম্মদ। মুসলমান পরিবারের পরম সান্নিধ্যে, আন্তরিক

Read More

মাওরিঃ হাজার বছরের সভ্যতার ধারক ও বাহক

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর একটি হলো ‘মাওরি’। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস নিউজিল্যন্ডে। ২০১৩ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট অনুযায়ী নিউজিল্যন্ডে মাওরি জনগোষ্ঠীর

Read More

ব্রাজিলিয়ান কার্নিভাল: রঙিন মনের ঝলমলে প্রদর্শনী

উৎসব হলো মানুষের চিরচেনা ঐতিহ্যের চাদরে মোড়ানো মন ও প্রাণের মেলবন্ধন। আর প্রদর্শনী তুলে ধরে ধাবমান মুক্ত মনের এক চিলতে আবেগ। আর

Read More

না ফেরার দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনেতা,আবৃত্তিকার কিংবা কবি- প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন সেরাদের একজন। সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পথের পাঁচালীর অপুকে। সেই সৌমিত্র আমাদের ছেড়ে

Read More

Get Chalkboard Contents straight to your email!​

Skip to content